বশির আহম্মদ মোল্লা (নরসিংদী প্রতিনিধি): ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শক্তিশালী ‘ঘুষ সিন্ডিকেটের’ বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমকে তড়িঘড়ি করে বদলি করা হয়েছে। একজন সৎ, সাহসী ও যোগ্য কর্মকর্তাকে তদন্ত ছাড়াই এভাবে প্রভাবশালী মহলের চাপে বদলি করায় নরসিংদীর সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই বদলি আদেশ বাতিল করে তাকে স্বপদে বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা, সড়ক ও জনপথ (সওজ) ও গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার, কানুনগো এবং স্থানীয় প্রভাবশালী দালাল চক্রের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। এই চক্রটি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সরকারের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। সাধারণত কৃষি জমি বা নালাকে ভিটি এবং ভিটিকে বাণিজ্যিক শ্রেণিতে দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই জালিয়াতি করা হতো। এমনকি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর রাতারাতি নিম্নমানের স্থাপনা নির্মাণ করে সেগুলোকে বাণিজ্যিক হিসেবে দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টাও চলেছে।
অভিযোগ উঠেছে, এই ঘুষ লেনদেনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তিপত্র তৈরি করা হতো, যার কিছু অংশ প্রশাসনিক নথির সঙ্গেও সংযুক্ত থাকার বিরল প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে মসজিদের দানকৃত জমি ব্যক্তির নামে দেখানো এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমিও ব্যক্তির নামে প্রস্তাব করার মতো গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত করেন এডিসি মাহমুদা বেগম। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের মূল বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ভুয়া ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল। মাহমুদা বেগম দায়িত্ব নেওয়ার পর রেকর্ড ও বাস্তব অবস্থা যাচাই করে এসব নিয়মবহির্ভূত আবেদন বাতিল করে দেন। এতে সরকারের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয় এবং সিন্ডিকেটের স্বার্থে বড় আঘাত লাগে।
স্থানীয়দের দাবি, এর আগে অনেক জমির মালিককে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও তার একটি বড় অংশই দালালদের পকেটে গেছে। এডিসি মাহমুদা বেগমের কঠোর অবস্থানের কারণে এই অবৈধ অর্থ লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রভাবশালী মহল তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। এরই জেরে গত ২৭ এপ্রিল তাকে পরিকল্পনা কমিশনে বদলি করা হয়েছে। ২০২০ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে সতর্কবার্তা দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নরসিংদীবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই বদলি স্থগিত করে পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
টিএইচএ/
