মুফতি এনায়েতুল্লাহ :: আমরা সবাই জানি, আয়নায় মুখ দেখা যায়। সমাজের মেধাবীরা জাতির আয়না। সমাজের সেই মেধাবী দর্পণগুলো যদি ভেঙে যায়, আয়নায় কাঙ্ক্ষিত মানের চিত্র ভেসে না আসে; তবে সেটা- দুঃখজনক।
জ্ঞানীরা বলেন, মেধাবীদের চেহারায় জাতির সামগ্রিক অবস্থার উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু মাঝে-মধ্যে এর উল্টোটাও হয়। সম্ভাবনার অপমৃত্য, নিষ্ঠুর মিথ্যাচার, অহেতুক প্রশ্ন উত্থাপন করে সম্ভাবনাময় মুখগুলোকে নষ্ট করা হয়। ফলে মেধাবীরা তাদের কাজ থেকে, দায়িত্ববোধ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। সম্ভাবনায় মানুষের এমন অকালপতন কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আবার অহেতুক নগ্ন সমালোচনা, কোনো কারণ ছাড়াই পেছনে লেগে থাকার ঘটনাকে পাত্তা না দিয়ে আপনগতিতে পথচলার মতো মানুষেরও অভাব নেই। তবে এ জন্য দরকার মনের সাহস, স্বচ্ছ সম্পর্ক ও সততাময় জীবন। যারা কোনো সমালোচনায়ই পথচলা থামান না। নানা কারণে মন ভারাক্রান্ত হলেও তা বুঝতে দেন না। ষড়যন্ত্রে ক্ষতবিক্ষত হয়েও হাসিমুখে নিজের কাজটি করে যান। ব্যথিত হৃদয়ের আর্তনাদের মাঝে খুঁজে বেড়ান সৃজনশীল কাজ। লোভ-লালসা, দলীয় সংকীর্ণতা, অলসতা, কারও পেছনের পরে থাকার মতো মন্দ অভ্যাসের বেড়াজাল ছিন্ন করে কাজ করে যান।
উম্মাহকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, আকাবির-আসলাফদের নকশে কদমে চলে তাদের আমানতকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চষে বেড়ান। গঠনমূলক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। তার কর্মোদ্দীপনা দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণে নিবেদিত। হতাশার সাগরে নিমজ্জিত যুবকরা তার সান্নিধ্যে এসে খুঁজে জীবনের স্বার্থকতা। গভীর আত্মমর্যাদাবোধ আর সহজাত হাসি তাকে করেছে অনন্য। তিনি আমার বন্ধু মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী। আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে ছাত্র অবস্থায় মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমানের সূত্রে তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সূচনা।
মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী। তিনি একাধারে দেশের নামকরা ওয়ায়েজ, মুফাসসিরে কোরআন ও ধর্মীয় আলোচক। খতিব, মাদরাসার শিক্ষক ও পীর। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছেন মসজিদ, মাদরাসা ও খানকা। রচনা ও সম্পাদনা করেছেন একাধিক বই। এসব বইয়ের মধ্যে দুই খণ্ডের ‘৩১৩ মাশায়েখে বাংলাদেশ’ অন্যতম। যে বইয়ে বাংলাদেশের ৩১৩ জন এবং পরিশিষ্টে আরও দশ জন আলেম-বুজুর্গের জীবনী একত্রিত করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশি ৩২৩ আলেমের জীবনীগ্রন্থ এটি। দুই খণ্ডের প্রতিটি ৫৭৬ পৃষ্ঠা করে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ইসলামের বাণী পৌঁছাতে, ইমান-আকিদার সংরক্ষণে এবং ইসলামি শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে যেসব পীর-মাশায়েখ ও নিভৃতচারী বুজুর্গরা কাজ করেছেন, তাদের নিয়ে এমন সমৃদ্ধ গ্রন্থ আর হয়নি। এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ মুসলিম কাউন্সিল’-এর আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে ঢাকার জোনাকী কনভেনশন হলে বসেছিল আলেম-উলামাদের মিলনমেলা। দেশি-বিদেশি আলেম-উলামা, রাজনীতিবিদ ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন ওই অনুষ্ঠানে।
শুধু ওয়াজ আর লেখালেখি নয়, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী ঢাকার উপকণ্ঠ হেমায়েতপুরে (সাভার) ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘মারকাযুত তারবিয়াহ বাংলাদেশ’ নামে একটি গবেষণাধর্মী দ্বীনি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। মাদরাসাতুস সুফফার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ ইলমচর্চা, সুস্থ চিন্তাধারা এবং আদর্শ চরিত্র গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ। মাদরাসাটিতে বর্তমানে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়মিত আবাসিক ও অনাবাসিক ব্যবস্থায় অধ্যয়ন করছে। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, মক্তব, নাজেরা, হিফজ, কিতাব বিভাগ (তাইসির থেকে শরহে জামী পর্যন্ত) এবং এক বছর মেয়াদি ইফতা বিভাগ। ভবিষ্যতে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) ও তাখাসসুসের বিভিন্ন উচ্চতর শাখা চালু করা হবে- ইনশাআল্লাহ।
এই প্রতিষ্ঠান ছাড়া আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার সঙ্গে তিনি জড়িত। ওই সব প্রতিষ্ঠানও যোগ্য, অভিজ্ঞ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকমণ্ডলীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় ১৯৭৯ সালের ৮ ডিসেম্বর মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবীর জন্ম। জামিয়া রাহমানিয়া থেকে ১৯৯৮-৯৯ শিক্ষাবর্ষে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এর পর থেকেই দীনের দাওয়াত নিয়ে বাংলাদেশের সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছেন।
বয়সে তরুণ, কিন্তু সান্নিধ্য পেয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, লেখক, শায়খুল হাদিস ও মুফাসসিরদের। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ., খতিব মাওলানা উবায়দুল হক রহ., শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ., মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ., চরমোনাইয়ের পীর সৈয়দ ফজলুল করিম রহ., আল্লামা আহমদ শফী রহ. ও মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী রহমাতুল্লাহি আলাইহিসহ গত দুই দশকে তিনি সবশ্রেণির আহলে হক আলেমদের ভালোবাসা, দোয়া ও রাহনুমায়ি পেয়েছেন।
তিনি যেমন খাদেমুস সুন্নাহ অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক রেখে চলেন দুই যুগ ধরে, তেমনি দেশের অসংখ্য আলেম ও তরুণ ওয়ায়েজ তার সঙ্গে ইসলাহি সম্পর্ক রেখে চলেন। খুতুবাতে আইয়ূবী ছাড়াও জান্নাতের পথ, তরিকুস সুলুক ও ফয়যানে মুরশিদ নামে তার কয়েকটি বই রয়েছে। ৫ সন্তানের জনক মাওলানা আইয়ূবীর সম্পাদনায় ‘মাসিক রাহে সুন্নাত’ নামে একটি ম্যাগাজিনও বের হয়েছে কয়েক সংখ্যা।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী বাংলাদেশ মুসলিম কাউন্সিল (বিএমসি) ও শায়খুল হাদিস পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সঙ্গে জাতীয় উলামা কাউন্সিল বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও কওমি মাদরাসা শিক্ষক পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন পালন করছেন।
স্বভাবসুলভ হাসিমাখা কথার জাদুতে মন জয় করে নেওয়া মানুষটিও কারাবরণ করেছেন, মামলার গ্লানি টেনে চলছেন এখনও। বিপদ-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও নিরবে-নিভৃতে মানুষের উপকার করা তার অন্যতম গুণ। আলেমসমাজ তাকে ভালোবেসে ‘সুলতানুল ওয়ায়েজিন’ বলে ডাকেন। তিনি ‘মাহবুবুল উলামা’ বা ‘আলেমদের প্রিয়জন।’
দোয়া করি তিনি এভাবেই আজীবন আহলে হকদের প্রিয়জন হয়ে থাকুন। আল্লাহতায়ালা তার সব কাজ কবুল করুন।
লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক
০২ মে ২০২৬
