নীলফামারীতে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ভয়াবহ ধস নেমেছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের বিশাল ফারাক থাকায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ বিক্রেতা, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। মূলত ট্যানারি সিন্ডিকেট, আগাম অর্থায়নের তীব্র সংকট, বকেয়া টাকা আদায় না হওয়া এবং দুর্বল বাজার মনিটরিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চামড়ার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী তিন দিন জেলার বিভিন্ন অস্থায়ী বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। আর বড় আকারের চামড়ার দাম উঠছে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন ছাগলের চামড়া নিয়ে, যা বাজারে মাত্র ৫ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ক্ষুব্ধ বিক্রেতারা জানান, লাখ টাকার ওপরে কোরবানির পশু কিনলেও চামড়ার বাজারে এসে তাদের চরম হতাশ হতে হচ্ছে। জেলার সৈয়দপুর উপজেলার এক বাসিন্দা জানান, তিনি ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা দিয়ে কোরবানির গরু কিনলেও তার চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ৪০০ টাকায়। সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ এভাবে ঠকছে বলে অভিযোগ তাদের।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ২০২৬ সালের দর অনুযায়ী ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট গরুর লবণের চামড়ার দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবে সেই দরের চার ভাগের এক ভাগ দামেও চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে না। অপরদিকে স্থানীয় আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত আগাম অর্থ না পাওয়া, লবণ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণের তীব্র সংকটের কারণে তারা সরকারি দরে চামড়া কিনতে পারছেন না। ফলে ছাগলের চামড়াসহ অন্যান্য চামড়া নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
এদিকে চামড়ার বাজারে এই নজিরবিহীন দরপতনে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে স্থানীয় এতিমখানা, হাফিজিয়া ও কওমি মাদরাসাগুলো। প্রতি বছর কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের দরিদ্র ও এতিম শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের ভরণপোষণ করা হয়। মাদরাসা কর্তৃপক্ষগুলো জানিয়েছে, চামড়ার দাম এভাবে পানির দরে নেমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারি মনিটরিং জোরদার করা, ট্যানারি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঢাকার ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের কাছে নীলফামারীর সৈয়দপুরের চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রায় দেড় কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাগিদ দিয়েও কোরবানি উৎসবের আগে এই পাওনা টাকা ফেরত পাননি তারা। ফলে চরম পুঁজি সংকটে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। পুঁজির অভাবে এবার কোরবানির চামড়া কেনার আগাম প্রস্তুতিও নিতে পারেননি অনেকে। ব্যবসায়ীদের একাংশের ধারণা, স্থানীয় বড় ক্রেতারা মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে চামড়া কিনতে না পারার কারণেই বাজারে এমন ধস নেমেছে। এই পুঁজি সংকট না কাটলে আগামীতেও চামড়া শিল্পের এই স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
টিএইচএ/
