হেরার ডাক : আলোর পথের পথিক

লাবীব আব্দুল্লাহ

by Masudul Kadir

‘‘এখানে এখন রাত্রী এসেছে নেমে,
তবু দেখা যায় দূরে বহু দূরে হেরার রাজতোরণ।
এখানে এখন অজস্রধারা উঠেছে দু’চোখ ছেপে,
তবু দেখা যায় দূরে বহু দূরে হেরার রাজতোরণ৷’’
— ফররুখ আহমদ

আমি বাংলায়। আজ আমি বড় অসহায়, বিপন্ন। আমি মজলুম, নির্যাতিত, নিপীড়িত। চারদিকে শুধু অন্ধকারের ভয়াল আচ্ছন্নতা, অমানিশা আর দীর্ঘ রাত—যেন শেষ নেই যার। মনে হয় এই ঘোর অমানিশাই কিয়ামতের দীর্ঘ বছর।

বিজ্ঞাপন
banner

চারপাশে আজ কোথাও মমতা নেই, দয়া নেই, নেই কোনো উদারতা। শুধু পিশাচ আর শয়তানের উন্মুক্ত তলোয়ার। খুনি, খাদক, দুর্নীতির লাল জিহ্বা আর লেলিহান লোভের শিখা গ্রাস করছে সবকিছু। সমাজ আজ যৌনাচার, পাপাচার আর অনাচারে নিমজ্জিত।
শাসক সে আজ যুগের ফেরাউন।

ধনিক শ্রেণি সে যুগের কারুণ। উজির-আমলা সে যেন হামানেরই বড় ভাই।

আমার অঙ্গনে শুধুই ভাঙন আর নির্মমতা। বনী ইসরাঈলের কলঙ্কিত স্বভাব মিশে গেছে আমাদের রগে-উপশিরায়। ধাপ্পাবাজি, ধোঁকাবাজি আর প্রতারণার যত অভিধান আছে, সবটাই বাস্তব আজ এই জনপদে। আমি কেবল ভাঙনের মিছিলে, কোথাও নেই নির্মাণে।

আমার মা-বোনেরা আজ টিএসসিতে লোলুপ থাবার খোরাক। ডাকাত নগরীর চল্লিশ চোর যেন একখানা ব্লাউজেরও খাদক। টকশোর বাচালরা অন্ধ, সত্য উচ্চারণে বোবা। শিশুর তাজা রক্ত সন্ত্রাসীদের সুরা; তারা মদমত্ত ও উৎসবপ্রিয়।

গণতন্ত্রের কন্যারা কেউ লোকদেখানো চোখ মুছে, কেউ হাসে ভিলেনের ক্রূর হাসি। হায় আফসোস, ভোট! গণতন্ত্র এখন খাকি পোশাকে বন্দি, ড্রোনের ডানায় উড্ডীন। ব্যালট নয়, বুলেট এখন আমাদের নিত্যদিনের ডাল-ভাত।

আমি আবু গারিবের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চিৎকার করে বলি কোথায় আজ মুসলমান?
গুয়ান্তানামো বে-তে দাঁড়িয়ে গাই আধুনিক অসভ্যতার জয়গান। শিয়া-সুন্নির দোহাই দিয়ে নিজেই ভাইকে খুন করি। মাযহাবি ও লা-মাযহাবির কৃত্রিম তরবারিতে মরি ও মারি। আমি ফিলিস্তিনের বুলেটে ঝাঁঝরা সেই নিষ্পাপ শিশু; আজ রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন এক আরব নাগরিক।
আমার রক্তে রঞ্জিত ঝিলাম নদী। মাওরাউন্নাহারের পুণ্যভূমি আজ এক বিরান মরুভূমি। বুখারা, সমরকন্দ, কুতুবমিনার আর কর্ডোভা আমার ভুলে যাওয়া গৌরবোজ্জ্বল অতীত। আমি মুসলমান, তাই যেন এই পৃথিবীতে বুকভরে সূর্য দেখার কোনো অধিকার আমার নেই। এই গোটা পৃথিবীটাই আমার এক বিশাল কারাগার। কেউ নেই আমার…।

তবে কি এখানেই শেষ?
না! হতাশার সাত সাগরে ডুবেও আমি একগুচ্ছ আলোর ঝলকানি দেখছি। আঁধার চিরে বিচ্ছুরিত হচ্ছে সেই আলো। হাজার বছরের কালো রাতেও আমি ভোরের সোনালি ঝিলিক দেখতে পাই। সব রুদ্ধ দ্বারের সুড়ঙ্গ পেরিয়ে খুঁজে পেয়েছি এক সরল, সঠিক ও পুণ্যময় পথ।

এ পথের যাত্রীরা আজ আলোর পাহাড়ে আরোহণ করছে জাবালে নূরে। এ তো হেজাজের চিরন্তন কাফেলা! স্বপ্নচারী পথিকদের চিরচেনা ঠিকানা। এ পথে শান্তির শীতল মেঘমালা, বয়ে যায় রহমতের অফুরন্ত ফোয়ারা। পথ পবিত্র কাবাতুল মুকাররমার; পথ হেরার আলোয় উদ্ভাসিত, উজ্জ্বল।

হেরা! গারে হেরা! জাবালে নূর—আলোর পাহাড়! যেখানে একদা নেমে এসেছিলেন রুহুল আমীন, জিবরাইল আমীন (আ.)। যেখানে ঘোষিত হয়েছিল মানবতার মুক্তির মহাসনদ, উচ্চারিত হয়েছিল মহাবিপ্লবের প্রথম ইশতেহার,
‘‘ইকরা! পড়ো তোমার রবের নামে…’’

যেখানে ‘আল্লামা বিল কালাম’ বলে মানবজাতিকে দেওয়া হয়েছিল সভ্যতার প্রথম পাঠ।
সেই আলোর পাহাড়—যেখানে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.) ধ্যানমগ্ন মানবতার মুক্তিদূতকে পরম মমতায় সেবা করেছিলেন দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস। যেখান থেকে রহমতের বৃষ্টিস্নাত কাবার নূরানী চত্বর দেখা যায়।

হে খোদা! আমার সব বন্ধ দরজা-কপাট খুলে দাও। আমি ছুটে যেতে চাই সেই আলোর পাহাড়ে, আরোহণ করতে চাই জাবালে নূরের সর্বোচ্চ শিখরে। সেখান থেকে অপলক নেত্রে দেখব তোমার রহমতের বারিধারা, দেখব মায়াবী কালো গিলাফে খচিত মক্কার পবিত্র কাবার সোনালি হরফ।
হাজরে আসওয়াদ, যমযম, মাকামে ইব্রাহিম, সাফা-মারওয়া…।

আমি শুনতে পাচ্ছি সেই হেরার মহাসিদ্ধ আহ্বান। চলেছি হেরার রাজপথে, আলোর পাহাড়ের পানে। আজ আর কোনো সংশয় নেই, চিন্তা নেই আমার।
কারণ, আমি এখন হেরার আলোর পথের পথিক!

লেখক : পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222