15
সতেরো.
পাক-ভারত উপমহাদেশে প্রচলিত রাজনীতিতে দেওবন্দী আলেমদের মধ্যে এ যাবৎ কালের সবচেয়ে সফল ব্যক্তি ধরা যায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানকে। তিনি রাজনীতিটাকে রাজনীতির নীতি পলিসির আলোকেই করেন। নিজ ঘরোনার প্রতিনিধিত্বশুলভ রাজনীতি তিনি করেন না। অবশ্য এজন্য তাকে অনেক মূল্য চুকাতে হয়েছে। ঘরে বাইরে সমালোচনার অনেক তির্যক বর্ষাবানে জর্জরিত হতে হয়েছে।
আমরা জানি পাকিস্তানের শিয়া-সুন্নি বিরোধ কতটা তুঙ্গে। তিনি ২০০২ সালে সেই শিয়াদেরসহ বেরেলভী ও জামাতে ইসলামীকে নিয়ে মুত্তাহিদা মজলিসে আমল গঠন করেন। পাকিস্তানের দেওবন্দি ঘরানায় তখন তীব্র সমালোচনা হয়। শিয়াদের সাথে সুন্নিদের ঈমান-কুফুরের বিভেদ ভুলে গিয়ে শিয়াদের কুফুরী আকীদাকে বৈধতা দিয়েছেন মর্মে জোরালো অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।
কয়েকদিন আগে মাওলানার এক বক্তব্য আমি শুনেছি, তিনি তার নির্বাচনী এলাকার কথা বলছেন যে, সেখানে শিয়া ও বেরলভী ভোটারদের আধিক্য রয়েছে।
তিনি তাদের ভোটেই নির্বাচিত হয়েছেন। কিভাবে হলেন? তিনি বলেন যে, আমি আমার ভোটারদেরকে শিয়া বা বেরেলভী হিসেবে মূল্যায়ন করিনি, মূল্যায়ন করেছি মানুষ হিসাবে। মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার আদায়ের অঙ্গীকার করেছি। তাদের আস্থা অর্জন করেছি। তারা আমাকে ভোট দিয়েছে। আমি নির্বাচিত হয়ে আমার ওয়াদা রক্ষা করেছি।
রাজনীতি করতে হলে নির্দিষ্ট ঘরানার প্রতিনিধিত্ব করে রাজনীতিতে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। তাই পাকিস্তানের মতো আকিদার জটিল বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডে রাজনীতি ও নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্য মূলনীতিগুলোকে অনুসরণ করেই মাওলানা ফজলুর রহমানের মত জাতীয় নেতৃবর্গ রাজনীতিতে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। তার রাজনৈতিক উত্থানে আখের নিজ ঘরানা দেওবন্দী আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসাগুলোই বেশি উপকৃত হয়েছে।
আমি মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবের প্রতিটি বিষয়ে অন্ধ অনুসরণ করছি না, তবে রাজনীতিতে তার এ নীতিকে অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ ও অনুসরণীয় বলে বিবেচনা করছি। রাজনীতির এই উদারতা ধারণ করতে না পারলে রাজনীতিতে সফল হওয়া দুরূহ ব্যাপার।
আঠারো.
বাংলাদেশে চারদলীয় জোট গঠনকে কেন্দ্র করে ইসলামপন্থীদের মধ্যে একটা মতপার্থক্য তৈরি হয়। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুল্লাহ বিএনপির নারী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ চারদলীয় জোটে অংশগ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে চরমোনাইয়ের মরহুম পীর সৈয়দ ফজলুল করিম রাহিমাহুল্লাহ নারী নেতৃত্বের প্রশ্ন তুলে ধর্মীয় অঙ্গনে ঝড় তোলেন। আজও পর্যন্ত এই দুই মহান নেতার অনুসারীদের মধ্যে সেই মতপার্থক্যের রেশ রয়ে গেছে। আমি আমার রাজনৈতিক পথ চলার ক্ষেত্রে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক
রাহিমাহুল্লাহসহ অপরাপর নেতৃবৃন্দের পথকেই অধিকতর সঠিক বলে মনে করি এবং আমার রাজনীতির পথ চলায় সেই দৃষ্টান্তকেই অনুসরণ করে চলছি। এই জাতীয় বিষয়গুলোকে বারবার বিতর্কে এনে নিজেদের মধ্যকার সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশকে ঘোলাটে করা আমার কাছে সমীচীন মনে হয় না।
উনিশ.
প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটা সাধারণ অনুসৃত নীতি ও সভ্যতা হলো, সরকারের যে কোনো কার্যকলাপকে সমালোচনা করা। এমনকি সরকারের কোন কাজে নব্বই ভাগ কল্যাণের দিক থাকলেও দশ ভাগ অকল্যাণের দিকটিকে
তুলে ধরে সরকারকে সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়।
সরকার অবশ্যই সব কুল রক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। কিন্তু সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রে তাদের সব সীমাবদ্ধতার হিসাব বিরোধী পক্ষ করবে না, এটাই এই রাজনীতির কালচার। আমরা বেগম খালেদা জিয়ার প্রথমবারের শাসনামলে স্লোগান দিতাম- বাঙালিরা ভাতে মরে খালেদা জিয়া মেকাপ করে। এই স্লোগান শুনে খালেদা জিয়া কিংবা তার দল তখনকার বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে কখনো তেড়ে আসতে দেখিনি। কিংবা দেখিনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতে। যেটা দেখেছি হাসিনার আমলে।
পাকিস্তানের কিংবদন্তিতুল্য রাষ্ট্রনায়ক জেনারেল জিয়াউল হক, যার মৃত্যুতে আল্লামা তাকি উসমানী তাকে শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং তার শাসনামলকে ইসলামের জন্য অত্যধিক উপকারী হিসেবে বিবেচনা করেছেন। মাওলানা তাকী উসমানী জেনারেল জিয়াউল হককে নিয়ে তার সুদীর্ঘ স্মৃতিচারণে তার অনেক অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিন্তু সেই জেনারেল জিয়াউল হকেরও সমালোচনা এবং বিরোধিতা করতে মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব এক চুল পরিমাণ ছাড় দেননি। বরং তাকে গণতন্ত্রবিরোধী স্বৈরাচারী এক নায়ক হিসেবেই আখ্যায়িত করতেন।
ইসলামি ফিকহেও শাসকের ভুল ত্রুটি ও তার দোষ চর্চা করা, তার বদনাম করা ঐ সকল ক্ষেত্রের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে, যে সকল ক্ষেত্রে কারো অগোচরে তার গীবত বা দোষ চর্চা করা জায়েজ। সুতরাং যে যখন ক্ষমতায় থাকবে তখন তার সমালোচনা হবে। সমালোচনারই আসন হল হলো ক্ষমতার চেয়ার।
পক্ষান্তরে রাজনীতিতে বিরোধী দলের সমালোচনা করা কিংবা তাদের ভুলত্রুটি নিয়ে যাচ্ছেতাই ভাবে আলোচনা করা প্রচলিত রাজনীতির নীতি কিংবা সৌজন্যতার মধ্যে পড়ে না। তবে হ্যাঁ পরস্পর যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা প্রতিযোগিতা থাকে, তখন নেতাকর্মীদের মধ্যে তার কিছুটা রেশ দেখা যায়। যেমন একসময় আমরা পাকিস্তানের মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবের নেতৃত্বাধীন জমিয়তের নেতাকর্মীদেরকে দেখেছি অপর বিরোধীদল ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন তেহরিকে ইনসাফের সাথে রেষারেষিতে লিপ্ত থাকতে। যদিও সেটা প্রচলিত রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সাথে বেমানান, এরপরেও একটা পর্যায় পর্যন্ত তা হতে পারে। আমার বিবেচনায় এটাও পরিহারযোগ্য। আমি মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবের একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত হওয়া সত্বেও তার এবং তার দলের এই নীতিকে পছন্দ করিনি। আমাদের নেতাকর্মীদের ব্যাপারেও এই নীতিই আমি সাজেস্ট করি ।
রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে সমালোচনা হবে সরকার ও প্রশাসনের। বিরোধীপক্ষ কখনো কোন বিষয়ে চূড়ান্ত সীমালংঘন করলে সে বিষয়ে শিষ্টাচারের মধ্যে থেকে সমালোচনা করা যেতে পারে।
তবে অবশ্যই আলেম ওলামাগণ জাতির মধ্যে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো বিচ্যুতি দেখলে সে বিষয়ে তারা তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করবেন, সেটা ভিন্ন আলাপ। তবে সেটা অবশ্যই রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে না হওয়া অধিক উপযোগী।
লেখক: আল্লামা মামুনুল হক। স্কলার, লেখক, অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ।
সূত্র: ফেইসবুক
টিএইচএ/