নিজস্ব প্রতিবেদক:: কওমী মাদ্রাসার বিরুদ্ধে চলমান বহুমুখী আদর্শিক আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখতে দায়িত্বশীলদের প্রতি ৭ দফা জরুরি প্রস্তাবনা দিয়েছেন বিশিষ্ট আলেম ও চিন্তাবিদ মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী।
রবিবার (২১ জুন) তিনি নিজ ভেরিফাই ফেসবুকে এক পোস্টে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই সংস্কারমূলক প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন।
মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী উল্লেখ করেন, বর্তমানে নাস্তিক্যবাদ, উগ্র হিন্দুত্ববাদ এবং বিভিন্ন ভ্রান্ত মত ও পথের অনুসারীরা পরিকল্পিতভাবে কওমী মাদ্রাসার বিরুদ্ধে নানামুখী অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও শীর্ষ ওলামাদের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তাঁর উত্থাপিত ৭টি মূল প্রস্তাবনা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মেজাজ ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ
গড়পড়তা বা ঢালাওভাবে শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতা পুরোপুরি পরিহার করতে হবে। যাদের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষাদানের মেজাজ, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এবং ছাত্র গঠনের মানসিকতা রয়েছে, কেবল তাদেরই পাঠদানের গুরুদায়িত্ব দেওয়া উচিত।
২. শিক্ষকদের আত্মশুদ্ধি নিশ্চিতকরণ
শিক্ষকদের শুধু বাহ্যিক অবয়ব বা ‘জাহিরী ইসলাহ’ নয়, বরং ‘বাতিনী ইসলাহ’ ও নিয়মিত আত্মশুদ্ধির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মানুষের নফস মন্দের দিকে ধাবিত হওয়া স্বাভাবিক, তবে সঠিক আলোচনার মাধ্যমে এর চিকিৎসা ও সংশোধন নিশ্চিত করতে হবে।
৩. মক্তব ও হিফজখানায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন
শিক্ষার পরিবেশকে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে দেশের প্রতিটি মক্তব ও হিফজখানাকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা জরুরি। এতে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের আস্থা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
৪. থানা ও জেলা পর্যায়ে ‘সমন্বিত সহযোগিতা টিম’ গঠন
প্রতিটি থানা ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ ওলামায়ে কেরামকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সমন্বয় টিম গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই টিম নিজ নিজ এলাকার ছোট-বড়, পাবলিক বা প্রাইভেট—সব ধরনের মাদ্রাসার নিয়মিত খোঁজখবর রাখবে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক শক্তি লাভ করবে এবং কোনো অপবাদ বা মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে সহজে কাউকে হেনস্তা করার সুযোগ থাকবে না।
৫. অনৈতিক ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা
কোনো প্রতিষ্ঠানে অনৈতিক বা আপত্তিকর ঘটনা ঘটলে তা কোনোভাবেই ধামাচাপা দেওয়া যাবে না। সত্য আড়াল না করে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক ও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে মাদ্রাসার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ না হয়।
৬. প্রাথমিক স্তর থেকেই আকিদাগত সচেতনতা
কওমী মাদ্রাসায় সাধারণত উচ্চতর জামাতগুলোতে আকিদার বিষয়গুলো পড়ানো হয়। এর ফলে নিচের জামাতের অনেক আবেগপ্রবণ ও অপরিপক্ব ছাত্র আকিদাকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করেছে। তারা আমলি অবক্ষয়কে বড় সমস্যা মনে করে বাতিল ফিরকাগুলোর প্রতি সহনশীল হয়ে উঠছে। অথচ প্রতিটি বাতিল ফিরকাই শেষ পর্যন্ত আকিদা ও আমল উভয়ের জন্য ধ্বংসাত্মক। তাই প্রাথমিক স্তর থেকেই আকিদার বিষয়ে ছাত্রদের সচেতন করতে হবে।
৭. প্রাইভেট মাদ্রাসার চ্যালেঞ্জ ও ‘পাইপলাইন’ রক্ষা
বিবৃতিতে মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানান, ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় অসংখ্য প্রাইভেট মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। ছাত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তাদের অনেকেই কওমী মাদ্রাসার বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে, যার প্রভাবে অনেক নূরানী মক্তব ও হিফজখানায় ছাত্রসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক ক্ষেত্রে কওমী মাদ্রাসার ফারেগীনরাই শিক্ষকতা করছেন। কিন্তু সেখানকার শিক্ষার্থীদের পরবর্তীতে কওমী মাদ্রাসায় ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা নেই, কারণ তাদের আলিয়া, স্কুল বা প্রাইভেট পরীক্ষার দিকে বেশি উৎসাহিত করা হচ্ছে। এমনকি দ্বীনি শিক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শের দিকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী সতর্ক করে বলেন, কওমী মাদ্রাসার প্রাথমিক স্তরের এই ‘পাইপলাইন’ বা ছাত্র সরবরাহ চেইন যদি দুর্বল হয়ে যায়, তবে তার মারাত্মক প্রভাব অনিবার্যভাবে উচ্চতর জামাতগুলোতেও পড়বে। তাই ঐতিহ্যবাহী কওমী ধারার স্বকীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে আবেগ পরিহার করে এখন থেকেই গভীরভাবে চিন্তা করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
হাআমা/
