আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: পাকিস্তানের সর্দারিটা এবার লিবিয়ায়ও হচ্ছে। লিবিয়ার দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক সংকট অবসানে নীরবে দেশটির পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা শুরু করেছে পাকিস্তান। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার সাফল্য পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াতে এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতেই এই পদক্ষেপ নিল ইসলামাবাদ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ২০১১ সালে ন্যাটো-সমর্থিত অভ্যুত্থানে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকেই লিবিয়া পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই প্রধান ক্ষমতার কেন্দ্রে বিভক্ত হয়ে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত রয়েছে। সেখানে রাশিয়া, তুরস্ক, মিশর ও ইউএই-র মতো বড় পক্ষগুলো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও পাকিস্তানের এই আকস্মিক মধ্যস্থতার ভূমিকা ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দুটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি অবগত এবং এর পেছনে মার্কিন সমর্থন রয়েছে। এ বছরেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের (যুক্তরাষ্ট্র-ইরান) মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মধ্যস্থতা করে পাকিস্তান ট্রাম্প প্রশাসনের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এছাড়াও ২০২৫ সালে রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে সই হওয়া পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ধারাবাহিকতায় এই শান্তি উদ্যোগে সৌদি আরবও সমর্থন দিচ্ছে, কারণ রিয়াদও দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়াতেও তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে আসছে।
উভয় সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের শেষের দিকে লিবিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষই পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা কামনা করলে এই শান্তি প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটে।
একদিকে পূর্ব লিবিয়ার সামরিক কমান্ডার সাদ্দাম হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) সঙ্গে পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। জাতিসংঘে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান এলএনএ-এর কাছে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জেএফ-১৭ ফাইটার জেট ও সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমানসহ বিপুল সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে গত মাসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সাথে পূর্ব লিবিয়ার সামরিক কমান্ডার সাদ্দাম হাফতারের বৈঠক হয়। এর পরপরই হাফতার ওয়াশিংটন সফর করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন।
অপরদিকে লিবিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ত্রিপোলিভিত্তিক গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটি (জিএনউ) পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের বড় দুই সমর্থক দেশ কাতার এবং তুরস্কও লিবিয়ার এই সংকট মেটাতে পাকিস্তানকে সম্পৃক্ত হতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে।
তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দেশটির সামরিক গণমাধ্যম শাখা, পশ্চিম ও পূর্ব লিবিয়ার কর্মকর্তারা এবং কাতার, তুরস্ক, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
এদিকে একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, ইসলামাবাদ লিবিয়ার উভয় পক্ষের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছে, এরমধ্যে রয়েছে— একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা, যেখানে জাতিসংঘ-স্বীকৃত ও পশ্চিমাঞ্চল-ভিত্তিক লিবীয় জাতীয় ঐক্য সরকারের আবদুলহামিদ দেবেইবাহ প্রধানমন্ত্রী এবং পূর্বাঞ্চল-ভিত্তিক লিবীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর উপ-অধিনায়ক সাদ্দাম হাফতার প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হবেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লিবিয়ায় তেল রাজস্বের ভাগাভাগি, রাজনৈতিক নিয়োগ এবং নির্বাচনী নিয়মকানুন নিয়ে জটিলতা অনেক বেশি। ফলে চুক্তি হলেও তা কতদিন টিকবে, তা নিয়ে এখনও সংশয় রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
