আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য তাজমহলকে ঘিরে ভারতে আবারও নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ঐতিহাসিক এই অনন্য স্থাপনার নিচে প্রাচীন কোনো হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে কেন প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ করা হবে না—এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগকে (এএসআই) কড়া নোটিশ জারি করেছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের নেতৃত্বে আবেদনকারী পক্ষের দাবি, তাজমহল আসলে মোগল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত কোনো নতুন স্মৃতিসৌধ নয়। তাদের হিন্দুত্ববাদী ভাষ্য অনুযায়ী, এটি মূলত ভগবান মহাদেবের উদ্দেশে নির্মিত একটি প্রাচীন শিব মন্দির, যার আদি নাম ছিল ‘তেজো মহালয়া’। আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে আদালতে দাবি করা হয়েছে যে, ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব এই বিশাল স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে মোগলরা ভারতের ক্ষমতা দখল করার পর এই মন্দিরটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় এবং সেটিকে মোগল স্থাপত্যের আদলে রূপান্তর করে।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের একক বেঞ্চে শুনানির সময় আবেদনকারী পক্ষ তাজমহল প্রাঙ্গণে হিন্দুদের নিয়মিত পূজার অনুমতি এবং পুরো স্থাপনাটি বৈজ্ঞানিক জরিপের জন্য আদালতের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে একজন বিশেষ কমিশনার নিয়োগের জোরালো আবেদন জানায়। এর আগে আগ্রার একটি নিম্ন আদালত পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক নথিপত্র ও তথ্যের অভাব দেখিয়ে একই ধরনের একটি আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। নিম্ন আদালতের সেই রায়ের বিরুদ্ধেই এবার উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করা হয়েছে, যা আদালত আমলে নিয়েছে।
বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই শ্বেতপাথরের স্থাপত্যটি সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে ইতিহাসবিদদের সর্বসম্মত অভিমত হলো, ১৬৩১ থেকে ১৬৫৩ সালের মধ্যে মোগল সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রয়াত প্রিয় স্ত্রী মমতাজ মহলের অমর স্মৃতি রক্ষার্থে তাজমহল নির্মাণ করেন। তবে বর্তমান আবেদনকারী পক্ষের দাবি, তাদের কাছে এমন ১০৯টি সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ রয়েছে, যা তাজমহলকে একটি প্রাচীন মন্দির হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে তাজমহল চত্বরে মুসলমানদের নিয়মিত নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়ার বিষয় এবং স্থাপনাটির ভূগর্ভস্থ বেশ কিছু কক্ষ আজীবন তালাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতাকেও এই আবেদনে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অযোধ্যার ঐতিহাসিক রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের পর থেকে ভারতে বিভিন্ন প্রাচীন মুসলিম ও মোগল ধর্মীয় স্থাপনার আদি পরিচয় নিয়ে একের পর এক মামলা দায়েরের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাজমহলকে ঘিরে এই নতুন আইনি পদক্ষেপকে সেই ধারাবাহিকতারই একটি সুদূরপ্রসারী নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা। আবেদনকারীদের মূল লক্ষ্য হলো, আদালতের নির্দেশে তাজমহলের ভেতরে ভিডিও ও ছবি ধারণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে শেষ পর্যন্ত এটিকে একটি ‘হিন্দু মন্দির’ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি আদায় করা। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার চূড়ান্ত রায় শুধু তাজমহলের পরিচয়কে ঘিরেই বিতর্ক উসকে দেবে না, বরং ভারতের প্রাচীন স্থাপনা ও ইতিহাস সংরক্ষণ-সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ আইনি প্রক্রিয়াতেও এক বিশাল ও সুদূরপ্রসারী নজির হয়ে উঠতে পারে।
টিএইচএ/
