বাংলা টাইপোগ্রাফির জগতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে লিপিকলা টাইপ ফাউন্ড্রি। এটি শুধু একটি ফন্ট ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং বাংলা অক্ষরশিল্পের এক বিস্তৃত শৈল্পিক গবেষণাগার। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজী যুবাইর মাহমুদ। বাংলা অক্ষরশিল্পের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ও চর্চা থেকেই লিপিকলার জন্ম।
কাজী যুবাইর মাহমুদ বলেন, ‘পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার জন্য শত শত উন্নতমানের ফন্ট পাওয়া গেলেও বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সেই ঘাটতি স্পষ্ট। বিশ্বের ৩০ কোটির বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে, অথচ আমাদের ভাষার জন্য শিল্পমানে উত্তীর্ণ ফন্টের সংখ্যা খুবই কম। বাংলায় ফন্ট তৈরি করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ। যুক্তবর্ণসহ বিশালসংখ্যক গ্লিফ তৈরি করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল। বর্তমানে ডিজাইন ও টাইপোগ্রাফির আধুনিকতার যুগে এসেও আমরা হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি উন্নত বাংলা ফন্ট দেখতে পাই। রাস্তাঘাটে, বিলবোর্ডে, লোগোতে কিংবা পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে ব্যবহৃত বাংলা টাইপোগ্রাফির বেশির ভাগই অপরিপক্ব ও দুর্বল মনে হয়। এই অভাববোধ থেকেই লিপিকলার জন্ম।’
২০২০ সালে করোনাকালীন সংকটের মধ্যে কাজী যুবাইর মাহমুদ লিপিকলার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেন। গত পাঁচ বছরে তারা প্রায় ১০০টি ফন্ট ডিজাইন করেছেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিকলার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এর আগেই দেশে এক গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারের পতন ঘটে। এই আন্দোলনের সময় তিনি অনুভব করেন, ফন্টের মাধ্যমেও প্রতিবাদ ও বিপ্লবের ভাষা তুলে ধরা সম্ভব।
একদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরুলের একটি কবিতার লাইন ব্রাশপেনে লিখলেন– ‘আমি চিনেছি আমারে আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ।’ এই লাইনটি দেয়াল লিখনের অভিজ্ঞতা থেকে আঁকা হয়েছিল, যেখানে আন্দোলনের আবেগ স্পষ্ট ছিল। তখন তার মনে হলো, এই শৈল্পিক প্রকাশকে একটি পূর্ণাঙ্গ ফন্টে রূপ দেওয়া দরকার। এই ভাবনা থেকে জন্ম নেয় লিপিকলার প্রথম আনুষ্ঠানিক ফন্ট ‘দ্রোহ’– বাংলার প্রথম প্রতিবাদী টাইপফেস।
১ আগস্ট ২০২৪-এ লিপিকলা থেকে ‘দ্রোহ’ ফন্টের ঘোষণা দেওয়া হয়। মাত্র এক দিনে পাঁচশর বেশি অক্ষর ডিজাইন করে ২ আগস্ট এটি উন্মুক্ত করা হয়। আন্দোলনের ভাষা ধারণ করে দ্রোহ ফন্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্লোগানে, ব্যানারে, প্ল্যাকার্ডে এই ফন্ট ব্যবহার করছে। এটি কাজী যুবাইর মাহমুদের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি, যা তাকে নতুন নতুন ফন্ট তৈরির অনুপ্রেরণা দেয়।
এএ/
