দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করায় দুই মুসলিম নারী সাংবাদিককে থানায় নিয়ে বেধড়ক মারধর ও সাম্প্রদায়িক হেনস্থার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ‘৪পিএম’ (4PM) নামের একটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক শাহীন খান ও নাফিসা খানের অভিযোগ, কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সাকেত পুলিশ স্টেশনে তাদের ওপর এই অমানবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে।
ভিআইপিদের আগমনকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করে এলাকার পরিচ্ছন্নতা দেখে তারা একটি স্বাভাবিক ভিডিও প্রতিবেদন করছিলেন। কিন্তু এটিই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা তারা কল্পনাও করতে পারেননি।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার উপস্থিতিতে সাকেতের ম্যাক্স হাসপাতালের একটি নতুন ভবন উদ্বোধনের কথা ছিল। সাংবাদিক শাহীন খান জানান, সকালে এলাকাটি হঠাৎ পরিচ্ছন্ন দেখতে পেয়ে তারা মুখ্যমন্ত্রীর একটি কাট-আউটের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করছিলেন। সেখানে তারা প্রশ্ন তোলেন—সাধারণ সময়ে যেখানে থানার সামনেও আবর্জনা জমে থাকে, সেখানে ভিআইপি-দের আগমনে কেন এই পরিপাটি রূপ?
ঠিক তখনই পেছন থেকে পুলিশ এসে তাদের হুমকি দেয় এবং ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে ডেকে আনা হয় নারী পুলিশ সদস্যদের। এরপর জোরপূর্বক তাদের সাকেত থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
ধর্মীয় পরিচয়ে নির্যাতন ও হাসাহাসি
নাফিসা খান জানান, থানায় নেওয়ার পর যখন পুলিশ জানতে পারে তারা মুসলিম, তখন তাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। শরীরজুড়ে লাঠির আঘাতের দাগ দেখিয়ে তিনি বলেন, “যাদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা, তারাই অত্যাচার করছে। যখন পুলিশ আমাদের পেটাচ্ছিল, তখন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসএইচও) চেয়ারে বসে হাসছিলেন।”
অভিযোগ রয়েছে, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সময় তাদের উদ্দেশ্য করে চরম অশ্রাব্য ও বর্ণবাদী ভাষায় কটূক্তি করা হয়। এমনকি প্রাথমিক চিকিৎসাও দেওয়া হয়নি; পরে জরুরি নম্বর ১১২-এ ফোন করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয় তাদের। পরবর্তীতে আঘাতের প্রমাণ নথিবদ্ধ করতে তারা এইমস (AIIMS) হাসপাতালে যান।
প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঝড়
এই অত্যাচারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সাকেত থানার সামনে জমে ওঠে বিক্ষোভ। সিপিআই-এমএল-এর ছাত্র সংগঠন আইসা (AISA) সহ একাধিক ছাত্র ইউনিয়ন থানার সামনে ধর্নায় বসে। আইসা নেত্রী নেহা বোরা প্রশ্ন তোলেন, “মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা কি অপরাধ? ধর্ম জিজ্ঞেস করে মারধর করার অধিকার কি সংবিধান পুলিশকে দিয়েছে?”
এদিকে প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান উইমেনস প্রেস কোর ও দিল্লি ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টসসহ একাধিক পেশাজীবী সংগঠন যৌথ বিবৃতি দিয়ে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা দিল্লি পুলিশ কমিশনারের কাছে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ‘৪পিএম’ নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে ঘটনাটি জানিয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলে ক্ষোভ
ঘটনাটি দিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গনেও তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আম আদমি পার্টি (আপ) এবং কংগ্রেস এই ঘটনার কড়া সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে প্রশ্ন করায় নারী সাংবাদিকদের পিটিয়ে আহত করা হচ্ছে, আর তাদের মুসলিম পরিচয় জানার পর সেই হামলা আরও তীব্র হচ্ছে। এটা কি গণতন্ত্র নাকি পুলিশি রাষ্ট্র?’
তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার ও জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সরব এখন ভারতের সাংবাদিক সমাজ।
