২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও তৈরি করেছে গভীর বিতর্ক। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে পুলিশের একাংশের প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার, নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি, শিশু-কিশোরসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি এবং পরবর্তী সময়ে এসব ঘটনার বিচার ও সংস্কার প্রক্রিয়া এখনো জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
গবেষণায় উঠে এল ভয়াবহ চিত্র
সম্প্রতি ‘সেন্টার ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড জাস্টিস’ এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের গবেষক মো. আবু বকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক মর্মান্তিক তথ্য—জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি ছয়জনের একজন ছিল শিশু। জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত ২৫৩টি মৃত্যুর ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহতদের অধিকাংশই ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ এবং তাদের একটি বড় অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিহতদের প্রায় ৪৬ শতাংশকে বুকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের যে কঠোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে, গবেষকদের মতে, এসব ঘটনার ধরন সেই নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া কর্মসূচি দ্রুত সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নিলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং দেশজুড়ে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
আন্দোলন দমনকারী কর্মকর্তাদের বর্তমান অবস্থা
আন্দোলন দমন ও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত পুলিশ কর্মকর্তারা বর্তমানে কে কোথায় আছেন—তা নিয়ে গণমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলন দমনে মেট্রোপলিটন, রেঞ্জ ও জেলায় এসপি পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন ১১৬ জন কর্মকর্তা। এর মধ্যে ৪১ জন বা ৩৫ শতাংশের বেশি কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন দপ্তরে স্বাভাবিক দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে পুলিশ সদর দপ্তর, এপিবিএন, রেলওয়ে পুলিশ কিংবা পুলিশ একাডেমি সারদায় ‘সংযুক্ত’ রাখা হয়েছে।
আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনের আওতার বাইরে থাকা এসব কর্মকর্তা পুলিশের ভেতর অনৈক্য সৃষ্টি করছেন। অন্যদিকে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় মাত্র ১৭ জনকে (১৪ শতাংশ) অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং অন্য ৫৭ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। ৬৪ জেলায় দায়িত্ব পালন করা ৭৭ জন এসপির মধ্যে ৩৫ জন বা ৪৫ শতাংশই এখনো বিভিন্ন দপ্তরে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের তদন্তেও নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
বিচার ও জবাবদিহির পথে চ্যালেঞ্জ
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জুলাই-আগস্টের সহিংসতার ঘটনায় বহু হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একাধিক তদন্ত চলছে। গবেষক মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেছেন, ‘শিশুদের মাথা ও বুকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সীমা অতিক্রম করে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এনায়েত উল্ল্যা পাটওয়ারীর মতে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি করে। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং কার্যকর পুলিশ সংস্কারই জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের একমাত্র পথ।
টিএইচএ/
