বশির আহম্মদ মোল্লা (নরসিংদী প্রতিনিধি): নরসিংদীতে তীব্র গ্যাস সংকট ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা এই দ্বিমুখী সংকটে গৃহস্থালি, গণপরিবহন এবং দেশের অন্যতম প্রধান এই শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে কলকারখানার চাকা ঘুরছে না, সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন এবং বাসাবাড়িতে দিনের পর দিন জ্বলছে না রান্নার চুলা। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের।
সরেজমিনে নরসিংদী শহর ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুই পাশে অবস্থিত সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ একেবারেই নেই। ফলে গ্যাস নেওয়ার জন্য গভীর রাত থেকে শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও যানবাহন পাম্পের সামনে ও মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে চালকদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং দিনশেষে আয় কমে যাওয়ায় তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম আর্থিক অনটনে পড়েছেন।
তীব্র গ্যাস সংকট ও বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে আঞ্চলিক সড়কগুলোতে অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল কমে গেছে। ফলে যাতায়াতকারী যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে চরম দুর্ভোগে। যেসব যানবাহন চলাচল করছে, তারা দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করায় যাত্রী ও চালকদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। আনিকা খানম নামে এক গৃহিণী জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে বাসায় গ্যাস না থাকায় রান্না বন্ধ রয়েছে এবং বাধ্য হয়ে চড়া দামে বাইরের খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।
অপর দিকে শিল্পনগরী নরসিংদীর শত শত টেক্সটাইল ও ডাইং মিলসহ বিভিন্ন মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানাগুলো গ্যাসের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে। কারখানার মালিকরা জানান, প্রয়োজনীয় প্রেসার না থাকায় উৎপাদন নেমে এসেছে তলানিতে। সময়মতো উৎপাদন করতে না পারায় কাপড়ের অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন মিল বন্ধ থাকায় শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। এমএমকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিক আলহাজ আব্দুল মোমেন মোল্লা জানান, পাম্পগুলোতে ১২ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও কোনো কোনো দিন তা শূন্য থেকে ২ পিএসআইয়ে নেমে আসছে।
জ্বালানি সংকটের এই আগুনে ঘি ঢালছে বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নরসিংদীর শহর ও গ্রামীণ এলাকায় দিন-রাতে সমানতালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। জেলাটির গ্রামগুলোতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা এবং শহরে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান সিআইপি রাশেদুল হাসান রিন্টু বলেন, গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানার চাকা অচল হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে চললে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং হাজার হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারাবে।
সার্বিক বিষয়ে নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, গ্যাসনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় রাতারাতি বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ বাড়েনি। আবার অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুনুর রহমান জানান, জেলার চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, যার একটি বড় অংশ ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সারকারখানায় দিতে হচ্ছে। তবে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামত হলে দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে জানান তিনি।
টিএইচএ/
