মাওলানা রাকিবুল ইসলাম ফারুকী >>
ঢাকার ডোনার দিয়ে সারাদেশের কওমি মাদরাসা চলে না। বিশেষভাবে শহরের বাহিরের মাদরাসা গুলো সর্ব শ্রেণীর মানুষের সহযোগিতায় চলে। আমাদের দেশের মুসলমানদের রাজনৈতিক আলাদা প্লাটফর্ম থাকলেও দেশের সিংহভাগ মুসলমান কওমি মাদরাসাকে মনে প্রাণে ভালোবাসেন। সেই ভালোবাসা থেকেই যার যার ভিন্ন দল ও রাজনৈতিক ভিন্ন চিন্তা থাকা সত্বেও কওমি মাদরাসার জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে সবাই সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা করেন।
দ্বিতীয়ত
রাজনৈতিক জটিলতা এবং বিরোধের কারণে আওয়ামীলীগ সমর্থিত মুসলমানদের একটি অংশ ইচ্ছে থাকা সত্বেও কওমি মাদরাসা থেকে বিমূখ। অথচ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগের একাংশ কওমি মাদরাসা বিদ্বেষী হলেও লোকাল পর্যায়ে গ্রামে গঞ্জে আওয়ামী লীগের সমর্থক মুসলমানদের বৃহৎ একটি অংশ নিয়ম তান্ত্রিকভাবে কওমি মাদরাসায় সহযোগিতা করতেন। শ্রদ্ধা করতেন ভালবাসতেন। অপরদিকে বিএনপি সমর্থিত সিংহ অংশ মানুষগুলো কওমি মাদরাসার প্রতি আন্তরিকতা রাখেন।নিবেদিত প্রাণ হয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সহযোগিতা করেন।
ভেবে দেখুন
কওমি মাদরাসায় মূলত দাওয়াতে তাবলীগে মেহনত করনেওয়ালা অনুসারী এবং আওয়ামীলীগ সমর্থিত মুসলমানদের একটি বৃহৎ অংশ ও বিএনপি’র সিংহ অংশ ও চরমোনাইয়ের তরিকার মানুষ গুলোর সন্তানরাই লেখাপড়া করেন ও কওমি মাদরাসায় প্রতি বছরে দান অনুদান করেন। অবশ্যই রাজনীতির বাহিরেও দেশের জনগণের একটা বিশাল অংশ কওমি মাদরাসার প্রতি আন্তরিক। ঢাকার বিভিন্ন মাদরাসা একক ডোনার দ্বারা চললেও গ্রামে গঞ্জে দেশের কওমি মাদরাসা গুলো দল মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়।
খেয়াল করে দেখুন
দাওয়াতে তাবলীগের একাংশের আমির মাওলানা সাআদ সাহেব ইস্যুতে দাওয়াতে তাবলীগের সেই অংশের সাথে কওমি মাদরাসার বেশ দূরত্ব চলে আসছে। রাজনৈতিক ধর্মীয় কারণে আওয়ামীলীগ সমর্থিত মুসলমানদের বৃহৎ একটি অংশ কওমি মাদরাসা থেকে দূরে। এদিকে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি পন্থী জনগণ [যারা কওমি মাদরাসার জন্য নিবেদিত প্রাণ] কওমি মাদরাসা থেকে বিমূখ হয়ে যাচ্ছে। যেটি কওমি মাদরাসাকে অর্থনৈতিক ভাবে ও সামাজিকভাবে হুমকির সম্মুখীন হতে হবে। আর এতে সবচেয়ে লাভবান হবে কওমি মাদরাসা বিদ্বেষী অংশ।
আমাদের আকাবেরগন বিশেষভাবে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. হাফেজ্জী হুজুর রহ. সৈয়দ ফজলুল করিম রহ. মুফতি আমিনী রহ. সহ যারাই ইসলামী রাজনীতি করেছেন কওমি মাদরাসার স্বার্থ রক্ষা করে রাজনীতি করেছেন। এমনকি অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ্ আহমাদ শফি রহ. আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ. আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রহ. সহ আমাদের মুরুব্বীরা হেফাজতকে পরিচালনার ক্ষেত্রেও কওমি মাদরাসার স্বার্থকেই প্রধান্য দিয়েছেন। কওমি মাদরাসার স্বার্থ বিলীন হয় এমন সকল সুযোগ সুবিধা থেকে আমাদের বড়রা নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছেন।তাই আজও তারা কওমি অঙ্গনে সবচেয়ে বড় ও বিশ্বস্ত কান্ডারী হিসেবে পরিচিত।
একটি কথা বললে না বুঝে অনেকেই গালি দিবেন তবুও বলতে হয় :
জুলাই বিপ্লবের পর ৮ দলের যখন সূচনা হয়নি এর পূর্বে থেকেই আমি মাঠে ময়দানে বিভিন্ন সেমিনারে রাজনৈতিক ঐক্যের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছি।নিজেও যেমন এই ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি পাশাপাশি জনগণকেও এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করেছি। হযরত বাবুনগরী রহ. সোহবেতের সুবিধার্থে যেহেতু দেশের শীর্ষ ইসলামী নেতৃবৃন্দের সাথে আমার যোগাযোগ রয়েছে তাদেরকেও রাজনৈতিক ঐক্যের জন্য আমি অনুরোধ করেছি। আমি আমার মনের আবেগ প্রকাশ করেছি। আমি মনেপ্রাণে চাই ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক ঐক্য। তবে সে ঐক্য হতে হবে কওমি মাদরাসার স্বার্থকে সামনে রেখে।
একটি বিষয় জাতির সামনে দীর্ঘ কয়েক যুগ পর্যন্ত স্পষ্ট:
৮ দলে যুক্ত কওমি অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত ফিগার শাইখুল হাদিস মাওলানা মামুনুল হক হাফিজাহুল্লাহ্ ও পীর সাহেব চরমোনাই এর সংগঠনের তরুণ উলামাদের নেতৃত্ব পরিপূর্ণভাবে কওমি মাদরাসার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকলেও অন্য দলের প্রবীণ নেতৃবৃন্দের একটি অংশ ও তাদের অনুসারীগন কট্টর কওমি মাদরাসা বিদ্বেষী। এদেশে তাদের হাতে কওমি মাদরাসার ওলামায়ে কেরাম বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এমনকি জুলাই বিপ্লবের পরেও বিভিন্ন জায়গায় কওমি মাদরাসা বিরোধী অবস্থানে তারা পূর্বের ভূমিকায় রয়েছেন। সুতারাং এমন পরিস্থিতিতে পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ার আগে আমাদের আলোচনায় আসা দরকার দেশের কওমি মাদরাসার স্বার্থ। যেন অন্তত কোন রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে কওমি মাদরাসা সামান্যতম আঘাত প্রাপ্ত না হয়। শহর থেকে গ্রামগঞ্জে আওয়ামী সরকারের পতনের পরেও দেশের মাদরাসা গুলো একশ্রেণীর কওমি মাদরাসা বিদ্বেষীদের হাতে নিপীড়নের শিকার। খুব সূক্ষ্মভাবে সামাজিকভাবে কওমি মাদরাসার ওলামায়ে কেরামকে এ নির্যাতন করা হচ্ছে। এবং প্রকাশ্যে কওমি মাদরাসাকে সমাজের বোঝা বলে বক্তব্য প্রদান করছে।কওমি মাদরাসায় যাকাত দেওয়া হারাম বলে ফতোয়া দিচ্ছে। দীর্ঘ ষোল বছরেও আআওয়ামী লীগের সাথে মিলেমিশে সর্বোচ্চ ক্ষতির চেষ্টা তারা অব্যাহত রেখেছি।নিজেদের স্বার্থের জন্য আমাদের কওমি মাদরাসার নেতৃবৃন্দকে তারা জাতির সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসবকিছু থেকে তারা আজও পিছিয়ে নেই। এমন উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ৮ দলের ঐক্যের ভিত্তি হওয়া দরকার কওমি মাদরাসার স্বার্থ। সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে আলোচনায় থাকা দরকার কওমি মাদরাসার। কারণ’ বাংলাদেশের সিংহভাগ জনগণ কওমি মাদরাসার সাথে সংশ্লিষ্ট। তা না হলে রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল হলেও দেশের কওমি মাদরাসা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
শেষ কথা :
এমন রাজনীতি থেকে কওমি মাদরাসা ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো সরে আচা উচিত যে রাজনীতির বেড়াজালে কওমি মাদরাসার সাথে সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষগুলো কওমি মাদরাসা বিমূখ হয়ে যাবে। মনে রাখবেন “দল যার যার, কওমি মাদরাসা সকল মুসলমানদের”। কওমি মাদরাসা গুলোকে যদি আমরা সার্বজনীন রাখতে না পারি এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আমাদের কিছুই হবে না।গ্রামে গঞ্জে মাদরাসার মুহতামিম সাহেবদের সাথে কথা বলে দেখবেন তাদের চোখে অশ্রু। গ্রামের মাদরাসা গুলো কত কষ্ট করে তারা পরিচালনা করেন সেটা না দেখলে বুঝানো মুশকিল। গ্রামে একজন মুহতামিমকে মাদরাসার জন্য ১০ হাজার টাকা ব্যবস্থা করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। বহু মাদরাসা এমন রয়েছে ওস্তাদদেরকে মাসে ২০০০ থেকে ৩ হাজার টাকা নগদ বেতন প্রদান করতে পারে না। তিন বেলা ছাত্রদের খাবার দিতে কষ্ট হয়। এমন চরম সংকটের মধ্য দিয়েও যদি কওমি মাদরাসার শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে রাজনৈতিক কারণে দূরত্ব তৈরি হয় সেটা কখনোই কওমি মাদরাসার স্বার্থ রক্ষা হবে না। এটা সম্পূর্ণ কওমি মাদরাসার স্বার্থ বিরোধী হবে। আর যেখানে কওমি মাদরাসার স্বার্থ নষ্ট হয় সেখান থেকে আমাদেরকে অনেক দূরে সরে আসা উচিত। ইসলামপন্থীদের ঐক্য চাই।শুধু ঐক্য নয় প্রাচীরের ন্যায় ঐক্য চাই। তবে কওমি মাদরাসার স্বার্থ রক্ষা করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কারণ কওমি মাদরাসার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব। মিশে আছে দেশের জনগণ।
শাইখুল হাদিস ক্বায়েদে মিল্লাত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.বলতেন, ‘কওমি মাদরাসার হাদিসের মসনদের মূল্য প্রধানমন্ত্রীর মসনদের চেয়েও বেশি। সুতরাং এ মূল্যবান মসনদ সামান্য সংসদীয় আসনের লোভে বিসর্জন দেওয়া কোন কওমির কান্ডারীর কাজ এটা হতে পারে না।’
আল্লাহ্ তায়ালা দেশের কওমি মাদরাসা গুলোকে হেফাজত করুন। সকল ধরনের রাজনৈতিক ঐক্যের মধ্যে কওমি মাদরাসার স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়ার তৌফিক দান করুন।
লেখক: মুহতামিম, দারুল ইরফান মাদরাসা ঢাকা ও দারুল উলুম আজিজিয়া মাদরাসা [ভেলুমিয়া] ভোলা।
হাআমা/
