শান্তির চেয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতিই বেশি দৃশ্যমান ভারত-পাকিস্তানের

by hsnalmahmud@gmail.com

দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র চার দিনের বিমান যুদ্ধের এক বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২৫ সালের মে মাসের সেই রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোর স্মৃতি আজ দুই দেশের রাজপথ ও সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন রূপে ফিরে এসেছে। রাওয়ালপিন্ডি থেকে নয়াদিল্লি- উভয় পক্ষই নিজেদের ‘বিজয়’ দাবি করে উৎসবে মেতেছে। তবে এই উৎসবের ডামাডোলে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতার ঘাটতি এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তানে চলতি মে মাস শুরু হয়েছে সামরিক নেতৃত্বের স্তুতি গেয়ে। রাওয়ালপিন্ডির নূর খান অডিটোরিয়ামে পাকিস্তান বিমান বাহিনী (পিএএফ) ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ‘সাফল্য’ উদযাপন করেছে। লাহোরের লিবার্টি চকে আয়োজিত কনসার্টে দিনটিকে ‘ব্যাটল অব ট্রুথ’ বা ‘সত্যের লড়াইয়ের দিন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

অন্যদিকে, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতেও চলছে উৎসবের আমেজ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর লোগো যুক্ত করে দেশবাসীকে সশস্ত্র বাহিনীর সাহসিকতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে এয়ার মার্শাল এ কে ভারতী দাবি করেছেন, তারা পাকিস্তানের ১৩টি বিমান ও ১১টি বিমানঘাঁটি ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছেন।

২০২৫ সালের মে মাসে পাহলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার জেরে শুরু হওয়া এই সংকটের রণকৌশলগত অর্জন নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘস্থায়ী। পাকিস্তানের জন্য বড় সাফল্য ছিল তাদের চীনা প্রযুক্তির জে-১০সি যুদ্ধবিমানের পারফরম্যান্স। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ভারতের অত্যাধুনিক রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার যে দাবি পাকিস্তান করেছিল, পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরের একটি সেমিনারে ভারতের তৎকালীন চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান পরোক্ষভাবে সেই ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেন।

অন্যদিকে, ভারত তার দূরপাল্লার ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের গভীরে আঘাত হেনে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়েছে। রাওয়ালপিন্ডির নূর খান এবং সিন্ধুর ভোলারি বিমানঘাঁটিতে ভারতের সুনির্দিষ্ট আঘাত পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নগ্ন করে দিয়েছিল। বিশেষ করে ইজরায়েলি ড্রোনের মাধ্যমে লাহোর ও করাচির আকাশে ভারতের অনুপ্রবেশ পাকিস্তনের জন্য ছিল এক বড় সতর্কবার্তা।

যুদ্ধের এক বছর পর পাকিস্তান তাদের ‘আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড’ এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। আইএসপিআর মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ত জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী ফাতাহ-৩, ৪ এবং ১০০০ কিমি পাল্লার ফাতাহ-৫ রকেট সিস্টেমের মোড়ক উন্মোচন করেছেন। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক তুঘরাল ইয়ামিন মনে করেন, এটি ভারতের ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের মোকাবিলায় একটি ‘ডকট্রিনাল’ পরিবর্তন। পাকিস্তান এখন প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির মাধ্যমে ভারতের হৃদপিণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে।

তবে কেবল নতুন অস্ত্র কেনাই যথেষ্ট নয়। যুদ্ধের সময় দেখা গেছে, পাকিস্তানের চীনের তৈরি এইচকিউ-৯বি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতের ব্রহ্মোস ঠেকাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এই টেকনিক্যাল গ্যাপ পূরণ করতে পাকিস্তান এখন এইচকিউ-১৯ ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের দিকে ঝুঁকছে, যা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ হাতে আসার কথা।

ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার না করলেও নেপথ্যে তাদের রণকৌশল পুনর্বিন্যাস করছে। ভারতের শক্তি প্রদর্শনের বড় জায়গা ছিল সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করা। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের জীবনরেখার ওপর এক ধরণের ‘অস্ত্রহীন যুদ্ধ’। ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে, ‘সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসবাদ’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা পানি নিয়ে কোনো ছাড় দেবে না।

কূটনৈতিক দিক থেকে পাকিস্তান কিছুটা এগিয়ে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকে কাজে লাগিয়ে। ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হওয়া এবং তাকে শান্তিতে নোবেল দেওয়ার প্রস্তাব পাকিস্তানের জন্য বিশ্বমঞ্চে একটি ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে। এমনকি বর্তমান সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের আমেরিকা ও ইরানের মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের সামরিক কূটনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

যুদ্ধের এক বছর পর দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির চেয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতিই বেশি দৃশ্যমান। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যদিও তাদের অর্থনীতি আইএমএফের ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে। বিপরীতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা পাকিস্তানের চেয়ে ৯ গুণ বড়।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-এর যুদ্ধ একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভৌগোলিক দূরত্ব এখন আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। ড্রোন, সাইবার হামলা এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের যুগে যুদ্ধ যে কোনো মুহূর্তে দুই দেশের প্রধান শহরগুলোতে পৌঁছে যেতে পারে। দুই দেশই নিজেদের জয়ী দাবি করে প্রকৃত দুর্বলতাগুলো যদি সংস্কার না করে, তবে পরবর্তী সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222