বিশেষ প্রতিবেদক:: আফগানিস্তানের শত বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস, ক্ষমতা এবং রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক ‘আর্গ’ বা কাবুলের রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ। যুগে যুগে যেখানে একের পর এক রাজা, আমির এবং আধুনিক রাষ্ট্রপ্রধানেরা বিলাসিতা ও আড়ম্বরে ভরপুর জীবন কাটিয়েছেন, সেখানে আজ বইছে এক সম্পূর্ণ বিপরীত ও অভূতপূর্ব হাওয়া। আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোল্লা হাসান আখুন্দ ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে বসেও রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ করে আঁকড়ে ধরেছেন চরম কৃচ্ছ্রসাধন ও সাধাসিধে গ্রামীণ জীবনধারা।
কাবুলের ঐতিহ্যবাহী এই প্রাসাদের আধুনিক আসবাব সরিয়ে সেখানে স্থান পেয়েছে সাধারণ কার্পেট, তোশক ও সুতির বালিশ। কোনো রাজকীয় ভাবগাম্ভীর্য নয়, বরং কান্দাহারের এক সাধারণ গ্রামের মাটির ঘরের মতো আড়ম্বরহীন পরিবেশে বসেই তিনি পরিচালনা করছেন রাষ্ট্রীয় কাজ।
ঐতিহাসিক প্রাসাদে সাধারণত্বের ছোঁয়া
কাবুলের ‘আর্গ’ কম্পাউন্ডের অভ্যন্তরে অবস্থিত দ্বিতল ‘হারেম’ প্রাসাদটি আফগানিস্তানের স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহ্যের এক বিরল নিদর্শন। আমির আবদুল রহমান খানের শাসনামলে রাজপরিবারের বসবাসের জন্য নির্মিত এই প্রাসাদে ইতিহাসজুড়ে বসবাস করেছেন একাধিক আফগান রাজা। এমনকি আফগানিস্তানের শেষ রাজা মোহাম্মদ জহির শাহও দেশে ফিরে এই ভবনেই বাস করতেন।
তবে আফগানিস্তানের শাসনক্ষমতায় তালেবান পুনরায় আসার পর এই রাজকীয় ভবনের ভেতরের চিত্রে এসেছে আমূল পরিবর্তন। সরকারি দপ্তরের বিলাসবহুল এক্সিকিউটিভ ডেস্ক, চামড়ার ঘুরন্ত চেয়ার কিংবা আধুনিক নকশার আসবাবপত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেগুলোর বদলে মেঝেতে পাতা হয়েছে সাধারণ কার্পেট এবং বসার জন্য রাখা হয়েছে তোশক ও হেলান দেওয়ার বালিশ।
মোল্লা হাসান আখুন্দ নিজের কার্যালয় এবং ব্যক্তিগত বাসস্থানকে একই গণ্ডির মধ্যে নিয়ে এসেছেন। আলাদা কোনো জমকালো দাপ্তরিক চেম্বার ব্যবহারের বদলে তিনি ঘরের তোশকে বসেই প্রশাসনিক ফাইল স্বাক্ষর করেন, কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন এবং মৌখিক নির্দেশনা দেন। রাষ্ট্রপ্রাসাদের ঐতিহাসিক সীমানার ভেতর নিজের গ্রামের মাটির ঘরের আবহ তৈরি করে তিনি পরিচালনা করছেন তাঁর দৈনন্দিন জীবন ও সরকার।
পশমল গ্রাম থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে
আজ যিনি আফগানিস্তানের সরকারের প্রধান, তাঁর জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। সত্তর বছর আগে আফগানিস্তানের কান্দাহার শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ‘পশমল’ নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেন মোহাম্মদ হাসান। আঙুরের বাগান ও মাটির ঘরের সেই সাধারণ গ্রামে তাঁর বাবা মোল্লা মোহাম্মদ তাকী স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতেন। সম্পদ বা জমির প্রাচুর্য তাদের ছিল না।
ছোটবেলা থেকেই সমবয়সীদের বিভিন্ন খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতার চেয়ে পিতার সঙ্গে মসজিদে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করতেন হাসান আখুন্দ। পিতার কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর ১৯৬১ সালে তিনি ডুরান্ড লাইনের ওপারে পাকিস্তানের কোয়েটা শহরের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা শুরু করেন। টানা প্রায় এক দশক ইসলামী আইনশাস্ত্র, হাদিস ও ধর্মীয় বিদ্যায় গভীর জ্ঞান অর্জনের পর তিনি ‘আখুন্দ’ উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করলে অনেক আলেম ও সাধারণ মানুষের মতো তিনিও লড়াইয়ে যোগ দেন। তৎকালীন ‘ইসলামিক বিপ্লব আন্দোলন’-এর হয়ে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। এ সময়ই তালেবানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোল্লা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের নেতৃত্বে ‘তেহরিক-ই-ইসলামী তালেবান’ গঠিত হয়, তখন প্রথম সারির নেতা হিসেবে এতে যোগ দেন হাসান আখুন্দ। তালেবানের প্রথম দফায় (১৯৯৬-২০০১) তিনি কান্দাহারের গভর্নর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রথম ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
ক্ষমতার আড়ালে সাধারণ জীবন ও শারীরিক বাস্তবতা
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সরকারের সর্বোচ্চ পদে কাকে বসানো হবে, তা নিয়ে নানামুখী জল্পনা ছিল। আন্তর্জাতিক পরিচিতি থাকা নেতাদের পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত কান্দাহার কেন্দ্রিক নীতি ও ধর্মীয় ভাবাবেগকে প্রাধান্য দিয়ে মোল্লা হাসান আখুন্দকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়।
তবে রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হলেও অন্যান্য দেশের মতো তাঁর জীবনে নেই কোনো আড়ম্বর। প্রবীণ এই নেতা সচরাচর জনসমক্ষে আসেন না এবং তাঁর বৈদেশিক সফরও বেশ সীমিত। দীর্ঘদিনের শারীরিক নানা জটিলতা ও বার্ধক্যের কারণেও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘অর্শ’ (পাইলস) রোগে ভুগছেন। এই শারীরিক সমস্যার কারণে দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে বসে কাজ করা তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য। এ কারণেই অফিসে বিলাসবহুল এক্সিকিউটিভ চেয়ারের বদলে তোশক ও বালিশ ব্যবহার করা তাঁর জন্য শারীরিক স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদিন খুব প্রয়োজন ছাড়া প্রাসাদ থেকে বের না হয়ে নিজের কক্ষে তোশকে বসেই প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখেন তিনি।
আর্গ প্রাসাদে অন্য নেতাদের অবস্থান
কাবুল দুর্গের ভেতরে শুধু মোল্লা হাসান আখুন্দই নন, পরিবার নিয়ে স্থান করে নিয়েছেন তালেবানের একাধিক শীর্ষ নেতা। বিশাল এই প্রাসাদ কম্পাউন্ডটি এখন বিভিন্ন নেতার দপ্তর ও বাসভবন হিসেবে বিভক্ত:
- মোল্লা আবদুল গনি বারাদার: উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি অবস্থান করছেন মূল প্রধানমন্ত্রীর প্রাসাদে।
- মোল্লা আবদুল সালাম হানাফি: অপর উপ-প্রধানমন্ত্রী অবস্থান নিয়েছেন গুলহানে প্রাসাদে।
- মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদ: প্রতিরক্ষামন্ত্রী অবস্থান করছেন এক নম্বর প্রাসাদে।
- অন্যান্য প্রবীণ নেতা: মোল্লা আবদুল মানান ওমারি, মোল্লা মোহাম্মদ ফজেল এবং মোল্লা আবদুল কবির আর্গের পৃথক ঐতিহাসিক ভবন ও প্রাসাদে বাস করছেন।
যদিও মোল্লা বারাদার বা মোল্লা ইয়াকুবের মতো অপেক্ষাকৃত তরুণ ও রাজনৈতিক নেতারা কিছুটা শহুরে জীবন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন, মোল্লা হাসান আখুন্দ নিজেকে একজন চিরাচরিত ‘সাদা দাড়িওয়ালা’ আলেম ও আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবেই ধরে রেখেছেন।
শাসনপদ্ধতি ও সাধারণত্বের দর্শন
পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র পরিচালনায় আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার চেয়ে আলেমদের ঐতিহ্যবাহী পন্থাই বেশি পছন্দ করেন হাসান আখুন্দ। দাপ্তরিক জটিল চিঠিপত্রের আদান-প্রদানের চেয়ে তিনি সরাসরি মৌখিক নির্দেশনা এবং পারস্পরিক আলোচনার ওপর বেশি জোর দেন।
গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রের পেছনে সময় দেওয়াকে তিনি সময়ের অপচয় বলে মনে করেন এবং নিজের বেশিরভাগ সময় ধর্মচর্চা ও প্রশাসনিক নথিপত্র পর্যালোচনায় ব্যয় করেন। তাঁর এই সাদামাটা প্রশাসনিক শৈলীর কারণে সরকারের বড় বড় আনুষ্ঠানিকতা ও অপচয় অনেকটাই কমে এসেছে।
প্রাসাদের ভেতর নিজের জন্য বাড়তি কোনো রাজকীয় প্রটোকল বা বিলাসিতার ব্যবস্থা তিনি রাখেননি। সকালের নাশতা ও প্রয়োজনীয় ধর্মীয় কাজ শেষে তিনি কয়েক ঘণ্টার জন্য তাঁর কক্ষে প্রস্তুতকৃত অফিসে বসেন। সেখানে তাঁর চিফ অফ স্টাফের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাজের আদেশ দিয়ে পুনরায় ফিরে যান নিজের ধর্মীয় পাঠ ও সাধারণ জীবনযাপনে।
কৃচ্ছ্রসাধনের এক নতুন বার্তা
কাবুল দুর্গের হাজার বছরের ইতিহাসে রাজকীয় বিলাসিতা ও আড়ম্বরের যে প্রথা চলে আসছিল, মোল্লা হাসান আখুন্দ তা পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন। ক্ষমতার সর্বোচ্চ চূড়ায় বসেও একজন মানুষের জীবন কতটা সাধারণ ও সাধাসিধে হতে পারে, আর্গ প্রাসাদের তোশক-কার্পেটের জীবনধারায় তিনি যেন তারই বাস্তব রূপ দেখিয়েছেন।
আধুনিক পৃথিবীর চোখধাঁধানো বিলাসিতা ও প্রশাসনিক আড়ম্বরকে দূরে ঠেলে দিয়ে শিকড়ের প্রতি এই অবিচল নিষ্ঠা ও গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখা আফগান রাজনীতিতে এক বিরল সাধারণত্বের পরিচয় বহন করে। সূত্র: আফগানিস্তান ইন্টারন্যাশনাল
