বিশেষ প্রতিবেদক:: ইলম অর্জনের মূল সৌন্দর্য তা জীবনে বাস্তবায়নের মধ্যে নিহিত রয়েছে উল্লেখ করে উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম আল্লামা মুফতি আবুল কাসেম নোমানী বলেছেন, আকাবিরে দেওবন্দ কেবল বড় মাপের আলেমই ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন আমলের পাহাড়, তাকওয়ার প্রতীক এবং ইখলাসের জীবন্ত উদাহরণ। তাঁরা যা জানতেন, তা আগে নিজের জীবনে প্রয়োগ করতেন। বর্তমান সমাজে ইলমের অভাবের চেয়েও ইলম অনুযায়ী আমল করার মানসিকতার বড় অভাব দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) যশোরে এক দ্বীনি আসরে উলামায়ে কেরাম ও শিক্ষকদের উদ্দেশে বয়ানকালে তিনি এসব কথা বলেন।
বয়ানকালে তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে বলেন—
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ﴾
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই সংক্ষিপ্ত আয়াতের মধ্যে মুসলিম জীবনের দুটি মৌলিক ভিত্তি তুলে ধরা হয়েছে—তাকওয়া এবং সত্যবাদীদের সাহচর্য। মানুষ একা থাকলে প্রবৃত্তি ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যায়; কিন্তু নেককারদের সঙ্গ অন্তরে আল্লাহর স্মরণকে সজীব রাখে।
তাকওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি সূরা ত্বলাকের আয়াত উদ্ধৃত করেন—
﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”
তিনি বলেন, মানুষ যখন সংকটে পড়ে হতাশ হয়ে যায়, তখন তাকওয়া নতুন পথ খুলে দেয়। গুনাহ মানুষের অন্তরকে অন্ধকার করে দেয় এবং ইবাদতের স্বাদ কেড় নেয়; তাই গুনাহ থেকে বাঁচার সংকল্পকে শক্তিশালী করতে হবে।
আত্মসমর্পণের প্রসঙ্গ টেনে হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি কুরআনের আয়াত উল্লেখ করেন—
﴿يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ﴾
“হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।”
আকাবিরে দেওবন্দও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে বিলীন করে দিয়েছিলেন।
আকাবিরদের আমানতদারিতার উদাহরণ দিয়ে দেওবন্দের মুহতামিম বলেন, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া (রহ.), হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এবং হযরত খলীল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.)-এর মতো বুজুর্গরা প্রতিষ্ঠানের একটি কাগজ, কলম, সময় কিংবা সামান্য সুযোগ-সুবিধাকেও আমানত মনে করতেন এবং তা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন না।
ব্যবসা ও দায়িত্বে সততার বিষয়ে তিনি সূরা আল-মুতাফ্ফিফীনের আয়াত তিলাওয়াত করেন—
﴿وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ﴾
“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা নিজেদের অধিকার গ্রহণের সময় পুরোপুরি নেয়, কিন্তু অন্যের অধিকার দেওয়ার সময় কম দেয়।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ আয়াতের শিক্ষা সব পেশার জন্যই প্রযোজ্য। যে শিক্ষক পূর্ণ বেতন নেন কিন্তু পাঠদানের প্রস্তুতি নেন না কিংবা দায়িত্ব অবহেলা করেন, তাঁকেও এই আয়াতের আলোকে আত্মসমালোচনা করা উচিত।
শিক্ষক ও আলেমদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিক্ষকরা আম্বিয়ায়ে কেরামের উত্তরাধিকার বহন করছেন। শ্রেণিকক্ষে প্রতিটি ছাত্র আল্লাহর আমানত। হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.)-এর মতো ছাত্রদের রাগ বা কঠোরতার মাধ্যমে নয়; বরং ভালোবাসা ও সংশোধনের মানসিকতা নিয়ে গড়ে তুলতে হবে।
সংবাদটির অনুলিপনে ছিলেন নিউমার্কেট যশোরের দারুত তারবিয়াতিল ইসলামিয়ার শিক্ষক মুহাম্মাদ ইমাম হাসান।
