বিশেষ প্রতিবেদক:: উপমহাদেশের ভূরাজনীতি, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শন আজও এ দেশের জাতীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও আপসহীন।
মজলুম জননেতা ভাসানী তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে বারবার সতর্ক করে গিয়েছেন যে, একটি স্বাধীন দেশের জাতীয় স্বকীয়তা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিবেশীর আগ্রাসী মনোভাবকে চিনতে হবে এবং তা প্রতিরোধ করতে হবে।
ফারাক্কা মার্চ ও পানিসম্পদ রক্ষার সংগ্রাম
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত অস্তিত্ব রক্ষায় মাওলানা ভাসানীর সবচেয়ে স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক অবদান ছিল ১৯৭৬ সালের ১৬ মে অনুষ্ঠিত ‘ফারাক্কা লং মার্চ’।
একতরফা পানি প্রত্যাহার: ভারত গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার শুরু করলে বাংলাদেশের বিশাল এলাকা মরুকরণের ঝুঁকিতে পড়ে।
ঐতিহাসিক লং মার্চ: জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ৯১ বছর বয়সে ৮০ হাজারেরও বেশি সর্বস্তরের মানুষ নিয়ে রাজশাহী থেকে গঙ্গার ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখে লং মার্চ পরিচালনা করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক নজর কেড়ে নেওয়া: তাঁর এই কর্মসূচির মাধ্যমেই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও সার্বভৌমত্বের অধিকার অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উঠে আসে।
সীমান্ত সমস্যা ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান
মজলুম জননেতা সবসময় বলতেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সমমর্যাদা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা আবশ্যক। কিন্তু ভারতের ভৌগোলিক আগ্রাসন, সীমান্তে নিরপরাধ বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা, বাণিজ্য বৈষম্য এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অসংগত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি তীব্র সোচ্চার ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাওলানা ভাসানী তরুণ প্রজন্মকে কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়, বরং একটি স্বাধীন আত্মপরিচয় ও সার্বিক সার্বভৌমত্বের পাহারাদার হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন, প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী কৌশল সম্পর্কে যে প্রজন্ম শতভাগ সচেতন থাকবে এবং দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দেবে, তারাই হবে এ দেশের সত্যিকারের রক্ষক ও শ্রেষ্ঠ সন্তান।
বর্তমান ভূরাজনীতি ও ভাসানীর সতর্কবার্তা
আজকের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা লাভ, সীমান্ত হত্যা চিরতরে বন্ধ করা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সমতা নিশ্চিত করার লড়াইয়ে ভাসানীর উক্তি ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বকীয়তা রক্ষার এই বার্তা প্রতিটি প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন দিকনির্দেশনা।
