ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার বিলিয়ন ডলারের অত্যন্ত সংবেদনশীল অস্ত্র চুক্তি ও সামরিক যোগাযোগের গোপন নথিগুলো ফাঁস করে দিয়েছে ইরানের গোয়েন্দা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত পরিচিত হ্যাকিং গোষ্ঠী ‘হানদালা’। ইসরায়েলি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’ এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ড্রপ সাইট নিউজ’ এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, ইসরায়েলের বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘এলবিট সিস্টেমস’-এর প্রধান নির্বাহী বেজালেল মাচলিসসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রাতিষ্ঠানিক ও সুরক্ষিত সিকিউর নেটওয়ার্কের পরিবর্তে সাধারণ ব্যক্তিগত জিমেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যগুলো আদান-প্রদান করছিলেন। এই চরম পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতির সুযোগ নিয়েই ইরানি গোয়েন্দাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ‘হানদালা’ গ্রুপ ওই ই-মেইলগুলো হ্যাক করে ইন্টারনেটে প্রকাশ করে দেয়।
ফাঁস হওয়া গোপন নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এবং বিশেষ করে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে আবুধাবিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনার পর থেকেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের অস্ত্র ক্রয়ের এই প্রক্রিয়াটিকে চরম জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। বর্তমান আঞ্চলিক ও চলমান ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আমিরাতের মাটিতে ইসরায়েলি অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও এই নথিতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ১৮ কোটি মার্কিন ডলারে ৬টি হার্মিস-৯০০ ড্রোন ও গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের চাহিদা বাড়িয়ে ৪৫টি ড্রোনসহ মোট ১৫টি ড্রোন সিস্টেম কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে, যার সর্বমোট আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরেও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সাইবার যুদ্ধ এবং ইলেকট্রনিক নজরদারিতে বিশেষ পারদর্শী ৪টি বিশেষ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের পরিকল্পনাও আমিরাতের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল।
ফাঁস হওয়া নথিপত্রের মধ্যে ‘জাসমিন ৩’ নামের একটি গোপন ও সংক্ষিপ্ত প্রজেক্টের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যার আওতায় মাত্র ৩ মাসের মধ্যে ৬ হাজার বিশেষ সামরিক উপাদান তৈরির পরিকল্পনা ছিল। মূলত ড্রোন বা বিভিন্ন গাইডেড বোমায় এসব উপাদান অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এর কিছু অংশ সরাসরি আমিরাতের নিজস্ব কারখানায় উৎপাদনের সুযোগও রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে, ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এলবিট সিস্টেমস’ ২০২৩ সালের নভেম্বরে নাম প্রকাশ না করে কোনো এক দেশের সঙ্গে ২.৩ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের একটি গোপন অস্ত্র চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিল। ফরাসি সামরিক সাময়িকী ‘ইন্টেলিজেন্স অনলাইন’ ফাঁস হওয়া নথির বরাত দিয়ে নিশ্চিত করেছে যে, সেই রহস্যময় গোপন গ্রাহকটি আসলে আর কেউ নয়, বরং সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেই।
তবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের ঘটনায় ‘এলবিট সিস্টেমস’-এর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে পুরোপুরি অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। তবে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার বা নাকচ করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, অত্যন্ত সময়োপযোগী এই তথ্য ফাঁসের মধ্য দিয়ে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির পর থেকে তেলআবিব ও আবুধাবির পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক কেবল আনুষ্ঠানিক চুক্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা একটি গভীর ও সমন্বিত সামরিক জোটে রূপ লাভ করেছে। এমনকি সম্প্রতি আমিরাতের নিজস্ব ভূখণ্ডে ইসরায়েলি ‘আয়রন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের ঘটনাও মূলত সেই কৌশলগত সামরিক অংশীদারিত্বেরই ধারাবাহিকতা।
টিএইচএ/
