চব্বিশের উত্তাল জুলাই আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজিরবিহীনভাবে ব্যবহার করেছে ৭.৬২ ক্যালিবারের বুলেট—যা মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে সামরিক রাইফেলে ব্যবহৃত হয়। সিভিলিয়ান বা সাধারণ নাগরিকদের রাজপথের আন্দোলনে এ ধরনের প্রাণঘাতী মারণাস্ত্রের অবাধ ব্যবহারে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে ব্যবহৃত অস্ত্রের মাত্রা ও ধরন নিয়ে কঠোর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, মারণাস্ত্র বলতে যা বোঝায়, এটি ঠিক তাই। আমি নিজে দেখেছি—৭.৬২ রাইফেলের একটি মাত্র বুলেটের আঘাতে এক যুবকের পুরো হাত ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। সিভিলিয়ানদের হাতেও এই অস্ত্র দেখা গেছে, যারা পুলিশের ছদ্মবেশে বা অংশ হয়ে সেখানে উপস্থিত ছিল। পুলিশকে এই সামরিক রাইফেল কারা ও কোন উদ্দেশ্যে সরবরাহ করেছে, তা প্রথম তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা ১৩০টি মরদেহের ওপর জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের চালানো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের ৬৬ শতাংশেরই প্রাণ গেছে সরাসরি সামরিক অস্ত্রের গুলিতে। এ ছাড়া ১২ শতাংশ ছররা শর্টগান, ২ শতাংশ পিস্তল এবং বাকি ২০ শতাংশ মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মম প্রহার ও অন্যান্য শারীরিক নির্যাতনের কারণে মারা গেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকেই পুলিশ বাহিনীকে অত্যাধুনিক মারণাষ্ট্রে সজ্জিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাহিনীর আধুনিকায়নের নামে কেনা হয় চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, বিডি-৮ অ্যাসল্ট রাইফেল ও টরাস ৯ এমএম পিস্তল, যার প্রথম চালান ইতালি থেকে আসে ২০১৫ সালে। এমন কি আন্দোলনের মাত্র ৩ মাস আগেও আরও ৫০টি এই ধরনের প্রাণঘাতী অস্ত্রের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দরপত্র আহ্বান করেছিল পুলিশ।
বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও সাংবিধানিক বিধিনিষেধের দিকে ইঙ্গিত করে সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক বলেন, সামরিক অস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়া বেসামরিক সীমানায় অন্য কারও কাছে থাকার সুযোগ নেই। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর কোনো অবস্থাতেই এই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা যায় না; সাংবিধানিকভাবে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় প্রস্তুতকৃত গোলাবারুদের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাংলাদেশ পুলিশ গ্রহণ করে থাকে। যেহেতু তারা ৭.৬২ মিলিমিটার গোলাবারুদ সংগ্রহ করে, সেহেতু ধরে নিতে হবে তাদের কাছে এ সংক্রান্ত অস্ত্রও বিদ্যমান রয়েছে।
অন্যদিকে অপরাধের দায়ভার নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে প্রধান দায় সবসময় মূল পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও প্রধান বাস্তবায়নকারীদের ওপরই বর্তায়। মাঠে থাকা সাধারণ কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্যদের অনেক সময় আদেশের বাইরে যাওয়ার উপায় থাকে না। আদালতের পূর্ব নজির অনুযায়ী, নিম্নপদস্থ সদস্যদের শাস্তির মাত্রা তুলনামূলক কম হয়। প্রধান অপরাধীরা বিচার ও শাস্তির ভয় থেকেই পলাতক রয়েছে। তবে অপরাধের চরম গুরুত্ব ও নৃশসংতার বিষয়টি বিবেচনা করেই তাদের জন্য আইনানুগ মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হয়।
টিএইচএ/
