বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হোয়াইট হাউস এবং ভ্যাটিকানের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সংঘাত দেখা দিয়েছে। যার মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গভীর মতবিরোধ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ট্রুথ সোশ্যালে পোপ লিও চতুর্দশকে আক্রমণ করে তাকে “অপরাধ দমনে দুর্বল” এবং “পররাষ্ট্রনীতির জন্য ভয়ংকর” বলে আখ্যা দিয়েছেন। পোপ তার আফ্রিকা সফরের সময় এর ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব দেন । এদিকে ক্যামেরুনে ঘোষণা করেন, বিশ্ব “মুষ্টিমেয় স্বৈরশাসকদের দ্বারা বিধ্বস্ত”, যারা যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে ধর্মীয় আখ্যানকে বিকৃত করে চলেছে। এই বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের প্রতি পোপের চলমান সমালোচনা।
বিশ্ব ক্ষমতার বিষয়ে মৌলিকভাবে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যে বিভেদ রয়েছে এর উৎসকে খুঁজে বের করতে হবে। পোপ লিও চতুর্দশ বারবার তার মঞ্চ ব্যবহার করে শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন এবং বিশেষ করে এই অঞ্চলের ছায়াযুদ্ধের মধ্যে ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকিকে “সত্যিই অগ্রহণযোগ্য” বলে নিন্দা করেছেন। এর প্রেক্ষাপটের কারণে পোপের এই হস্তক্ষেপের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। শিকাগোতে জন্মগ্রহণকারী পোপ লিও চতুর্দশ হলেন প্রথম আমেরিকান পোপ। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই দাবির পর বিষয়টি আরও প্রকট হয়ে ওঠেছে। ট্রাম্প বলতে চাইছেন, “কারণ তিনি একজন আমেরিকান” বলেই এই পদে উন্নীত করা হয়েছে।
যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভ্যাটিকানকে একটি গতানুগতিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেন, তখন এই সংঘাতটি শান্ত কূটনৈতিক টানাপোড়েন থেকে জনসমক্ষে এক নাটকীয়তায় পরিণত হয়। বহুল প্রচারিত বিবৃতিতে তিনি হলি সি-কে উগ্র বামপন্থী প্রভাবের জন্য অভিযুক্ত করেন। আর এই সংঘাতকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে পোস্ট করেন যে, “আমি যদি হোয়াইট হাউসে না থাকতাম, তাহলে লিও ভ্যাটিকানে থাকতেন না।” এই কৌশলটি তার জবরদস্তিমূলক কূটনীতির বৃহত্তর কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিতর্কটি চরমে পৌঁছায় যখন ট্রাম্প যিশুর মতো ভঙ্গিতে নিজের একটি এআই-নির্মিত ছবি শেয়ার করেন। আর পরে তিনি একথাও স্বীকার করেন, তিনি পোপের “খুব বড় ভক্ত নন”।
হলি সি-র প্রতিক্রিয়া নৈতিক মতবাদের প্রতি তাদের দৃঢ় আনুগত্য প্রদর্শন করে। পোপের বিমানে থাকাকালীন, পোপ লিও চতুর্দশ ট্রাম্পের ডিজিটাল উস্কানির সরাসরি জবাব দিয়ে বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসনকে আমার কোনো ভয় নেই।” তিনি “রক্তপিপাসু স্বৈরশাসক” এবং “হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে” শত শত কোটি ডলার অপচয়কারী ব্যক্তি। তিনি তার বৈশ্বিক যুদ্ধব্যবস্থার নিন্দা করেন। ওয়েবারীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায়, পোপ ব্যক্তিগত আক্রমণের চেয়ে শাশ্বত নৈতিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে ওয়াশিংটনের ক্যারিশম্যাটিক ও জনতুষ্টিবাদী শক্তির মোকাবিলায় ঐতিহ্যগত ও নৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
এই আন্তর্জাতিক বিবাদটি তাৎক্ষণিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের জন্য। সম্প্রতি ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত এবং হোয়াইট হাউসের একজন প্রধান রক্ষণশীল কণ্ঠস্বর হিসেবে, তিনি এক সংকীর্ণ রাজনৈতিক দড়ির উপর দিয়ে হাঁটছেন – একদিকে প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি রক্ষা করছেন, অন্যদিকে নিজের ধর্মীয় পরিচয়ও বজায় রাখছেন। ভ্যান্স পোপকে আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণের পরিবর্তে “নৈতিকতার বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে” এবং “ক্যাথলিক চার্চে কী ঘটছে” সেদিকে মনোযোগ দিতে অনুরোধ করেন। তিনি পোপকে আধুনিক রাষ্ট্রপরিচালনার ধর্মতত্ত্ব নিয়ে কাজ করার সময় “সতর্ক থাকতে” বলেছেন। আর একই সাথে স্বীকার করেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে “দুর্বল” বলায় অনেক ক্যাথলিকই ক্ষুব্ধ হন।
এই বিবাদের নির্বাচনী প্রভাব ইতোমধ্যেই জনমত জরিপের তথ্যে স্পষ্ট। আমেরিকান ক্যাথলিকদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আর প্রশাসনের আগ্রাসী ইরান নীতির কারণে তার প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে। অন্যদিকে, পোপ লিও চতুর্দশ মার্কিন ক্যাথলিকদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ জনপ্রিয়তায় রয়েছেন । ক্যাথলিক সমর্থনের এই ক্ষয়—যা ট্রাম্পের ২০২৪ সালের বিজয়ের অবস্থানকে নড়বড়ে করতে পারে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলেছেন।
আমেরিকা ফার্স্ট জনতুষ্টিবাদী কর্মসূচি এবং যুদ্ধের নৈতিকতা বিষয়ে ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিকদের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাকে বিবৃত করে। এই সংঘাত প্রশাসনের ধর্মীয় রক্ষণশীলদের বৃহত্তর জোটের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই বিবাদটি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির এক গভীর সংঘাতকে মূর্ত করে, যা একজন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রেসিডেন্টকে একজন গভীরভাবে আমেরিকান পোপের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। মেরুকৃত বিশ্বাস ও গোষ্ঠীগত রাজনীতির এই যুগে, প্রশ্নটি উঠে আসে: ভ্যাটিকান ও হোয়াইট হাউস কি আরও ধ্বংসাত্মক সংঘাত ছাড়াই সহাবস্থান করতে পারবে কিনা?
আল আরাবিয়া থেকে অনূদিত : মাসউদুল কাদির
লেখক : আব্দুল্লাহ এফ. আলরেভ। তিনি মিশিগানের গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ধর্মের সমাজতত্ত্ব ও সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের সহযোগী অধ্যাপক, ওয়াশিংটন ডিসি-তে অবস্থিত মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের একজন অনাবাসিক গবেষক।
