‘কুরবানি’: একটি গরুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে লাখো মানুষের ভাগ্যের চাকা

হাসান আল মাহমুদ

by hsnalmahmud@gmail.com

পবিত্র ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এটি এক বিশাল চালিকাশক্তি। একটিমাত্র গরুকে কেন্দ্র করে কুরবানির সময়ে যে বিশাল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়, তা গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে শহরের কর্পোরেট বাজার পর্যন্ত এক অভাবনীয় গতিশীলতা তৈরি করে। পশুপালনকারী প্রান্তিক খামারি থেকে শুরু করে কসাই, মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং লবণের ডিলার, সবার ঘরেই কুরবানির উছিলায় পৌঁছায় ঈদের আনন্দ।

একটি গরু কুরবানি করার মাধ্যমে সমাজের কোন কোন শ্রেণী অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন এবং কীভাবে এটি আমাদের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

বিজ্ঞাপন
banner

প্রান্তিক খামারি ও পশুপালনকারী

কুরবানির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেন দেশের লাখো ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি। সারা বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে লালন-পালন করা গরু এই সময়ে ভালো দামে বিক্রি করে তারা তাদের সারা বছরের আয়ের বড় অংশটি ঘরে তোলেন। দেশীয় পশুর চাহিদার প্রায় শতভাগ এখন অভ্যন্তরীণ খামারিরাই পূরণ করছেন, যার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল পুঁজির প্রবাহ তৈরি হচ্ছে।

গো-খাদ্য ও ওষুধ ব্যবসায়ী

একটি গরু কুরবানির হাটে তোলার আগ পর্যন্ত তাকে খাওয়াতে হয় খড়, ভুসি, খৈল ও ঘাস। কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে কয়েক মাস আগে থেকেই গো-খাদ্যের বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এছাড়া পশু চিকিৎসকের ফি এবং পশুর ভিটামিন ও ওষুধের ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিরাও এই সময়ে বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন করেন।

পরিবহন খাত ও হাট ইজারাদার

গ্রামের খামার থেকে শহরের পশুর হাটে গরু নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন হয় ট্রাক, পিকআপ বা ট্রলারের। ফলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের (চালক ও হেলপার) আয় এই সময়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অন্যদিকে, পশুর হাটগুলোর ইজারাদার এবং হাটের হাসিল (ট্যাক্স) আদায়ের সাথে জড়িত হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জন হয় এই কয়েক দিনে।

কসাই এবং মৌসুমি মাংস প্রস্তুতকারী

ঈদের দিন সকাল থেকেই সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা বাড়ে পেশাদার কসাইদের। একটি বড় গরুর চামড়া ছাড়ানো এবং মাংস কাটার জন্য কসাইরা আকারভেদে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি নেন। পেশাদার কসাইদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক দিনমজুর ও মৌসুমি শ্রমিক এই কাজে যুক্ত হয়ে মাত্র এক বা দুদিনে ভালো অঙ্কের টাকা আয় করেন, যা তাদের পরিবারের ঈদের খরচ মেটাতে সাহায্য করে।

চামড়া শিল্প ও লবণ ব্যবসায়ী

কুরবানির পশুর চামড়াকে বলা হয় দেশের ট্যানারি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পে সারা বছরে যে পরিমাণ চামড়া লাগে, তার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই সংগৃহীত হয় এই কুরবানির মাত্র ৩-৪ দিনে।

লবণের বিশাল বাজার

কাঁচা চামড়া পশু থেকে ছাড়ানোর পর ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে যদি লবণ দেওয়া না হয়, তবে চামড়া পচে নষ্ট হয়ে যায়। একটি গরুর চামড়া সংরক্ষণ করতে পশুর আকারভেদে ৭ থেকে ১০ কেজি লবণের প্রয়োজন হয়। ফলে এই সময়ে কক্সবাজারের লবণ চাষি থেকে শুরু করে পাইকারি বিক্রেতাদের ব্যবসা চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

মাদ্রাসা ও এতিমখানা

সাধারণ মানুষ এই চামড়া মাদ্রাসা বা এতিমখানায় দান করেন। মাদ্রাসাগুলো তা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে বড় অঙ্কের একটি তহবিল পায়, যা দিয়ে সারা বছর অসহায় শিশুদের ভরণপোষণ করা হয়।

ট্যানারি ও বৈদেশিক মুদ্রা

সংগৃহীত এই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে পরবর্তীতে জুতা, জ্যাকেট ও ব্যাগ তৈরি হয়, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।

কামার ও মশলা ব্যবসায়ী

কুরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য দা, বঁটি, ছুরি এবং চাপাতির বিকল্প নেই। ঈদের আগের মাস জুড়ে কামারপাড়ার কারিগররা দিনরাত কাজ করে বেশ ভালো আয় করেন। পাশাপাশি, মাংস রান্নার প্রধান অনুষঙ্গ পেঁয়াজ, রসুন, আদা, এলাচ, দারুচিনির মতো মশলা আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতাদের ব্যবসাও এই সময়ে বছরের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কুরবানির অর্থনীতি হলো একটি আদর্শ ‘সম্পদ বণ্টন’ প্রক্রিয়া। ধনীদের হাত থেকে টাকা সরাসরি সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক এবং শ্রমজীবী মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। এই সময়ে বাজারে যে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের প্রবাহ ঘটে, তা দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।”

উল্লেখ্য, একটি গরু কুরবানি দেওয়ার অর্থ কেবল একটি ধর্মীয় আচার পালন নয়; এর পেছনে জড়িয়ে রয়েছে লাখো মানুষের রুটি-রুজি। খামারি থেকে শুরু করে কসাই আর চামড়া ব্যবসায়ী, প্রত্যেকের পকেটেই এই উৎসবের অর্থনৈতিক সুফল পৌঁছায়। তাই বলা যায়, কুরবানির পশুর প্রতিটি অংশ এবং এর সাথে জড়িত প্রতিটি ধাপ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে প্রতি বছর এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222