৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরবর্তী ১৭ মাসে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সংঘাত ও দখলদারিত্বের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সারা দেশে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৮ জন এবং আহত হয়েছেন সাত সহস্রাধিক মানুষ।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ‘কর্তৃত্ববাদের পতনের দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। গবেষণার তথ্যমতে, অধিকাংশ সংঘাতের মূলে রয়েছে বিগত সরকারের আমলের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন খাতের দখল নেওয়ার চেষ্টা। বিশেষ করে পরিবহন টার্মিনাল, পাথর কোয়ারি, বালুমহাল, হাটবাজার এবং ঘাট ইজারার নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়েই এই সংঘর্ষগুলো ঘটেছে।
সহিংসতার পরিসংখ্যান ও দলের সংশ্লিষ্টতা
টিআইবি’র তথ্যানুযায়ী, মোট সহিংসতার ৯১.৭ শতাংশ ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০.৭ শতাংশে আওয়ামী লীগ, ৭.৭ শতাংশে জামায়াতে ইসলামী এবং ২.২ শতাংশ ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। একই ঘটনায় একাধিক দলের সম্পৃক্ততা থাকায় শতাংশের হিসাব ১০০ ছাড়িয়েছে। পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ৫৫০টি ঘটনায় বিএনপি এবং ১২৪টি ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সরাসরি নাম উঠে এসেছে।
নিয়োগ ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ছায়া
প্রতিবেদনে প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল সচিবালয় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন স্তরে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তোলা হয়েছে। টিআইবি বলছে, কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রভাব যেমন লক্ষ্য করা গেছে, তেমনি অনেক স্থানে আওয়ামী লীগের পুরোনো বলয় এখনো সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা নিয়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রশ্ন তুলেছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
মব জাস্টিস ও সাংস্কৃতিক
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ‘মব’ তৈরির সংস্কৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। মাজার ভাঙচুর, নারীদের হেনস্তা, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার মতো ঘটনাগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নাম আসলেও সরকার বা সংশ্লিষ্ট দলগুলো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় তদন্ত ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকায় জনমনে সংশয় তৈরি হচ্ছে।
পর্যবেক্ষণে টিআইবি জানায়, নিজেদের নেতাকর্মীদের সহিংস কর্মকাণ্ড রুখতে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। উপদলীয় কোন্দল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে দলগুলোর ব্যর্থতা দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টিএইচএ/
