তানবিরুল হক আবিদ>> বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন যখন আমাদের দুয়ারে করাঘাত করছে, তখন ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এক মরণব্যাধি হয়ে তরুণ সমাজের নৈতিকতাকে গ্রাস করছে। ২৭০ খ্রিস্টাব্দের রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের নির্দেশে সাধু ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ডকে কেন্দ্র করে যে দিবসের সূচনা, আজ তা বাংলাদেশে ১৯৯৯ সাল পরবর্তী সময়ে এক শ্রেণির মিডিয়ার অতি-উৎসাহে তরুণ প্রজন্মের কাছে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। অথচ এই দিবসের ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, এর সাথে জড়িয়ে আছে পৌত্তলিক রোমকদের নানা কুসংস্কার এবং ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের রহস্যময় জীবনকাহিনী।
ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো বিশেষ দিবস পালন বা বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ কেবল গর্হিত নয়, বরং ঈমানি চেতনার পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত গণ্য হবে” (আবু দাউদ)।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমানে এই দিবসের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পার্ক ও পাঁচতারা হোটেলে যে নগ্নতা, উল্কি আঁকা এবং অসামাজিক মেলামেশা চলে, তা সামাজিক শৃঙ্খলা ও পবিত্রতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে চায়, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি” (সূরা নূর: ১৯)।
ইসলাম ভালোবাসাকে অস্বীকার করে না; বরং ইসলামই ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ কারিগর। তবে এই ভালোবাসা হতে হবে পবিত্র। ভালোবাসা আল্লাহর এক মহান নিয়ামত, যা প্রতিটি মাখলুকাতের হৃদয়ে তিনি গেঁথে দিয়েছেন। মায়ের গর্ভে সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়, পিতার হাড়ভাঙা খাটুনি আর বনের হিংস্র পশুর স্বজাতির প্রতি মমতা—সবই মহান রবের দান। কিন্তু এই ভালোবাসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট তিথি বা দিনের প্রয়োজন নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত ভালোবাসা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসা।
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা করেছেন যে, যারা আল্লাহর মহব্বতে একে অপরকে ভালোবাসে, তাদের জন্য আল্লাহর ভালোবাসা ওয়াজিব হয়ে যায়। কিয়ামতের কঠিন দিনে যখন কোনো ছায়া থাকবে না, তখন এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পোষণকারীরা নূরের মিম্বরে আসীন থাকবে, যা দেখে নবী ও শহীদগণও ঈর্ষা করবেন।
কিন্তু বর্তমানের তথাকথিত ভালোবাসা দিবস সেই পবিত্রতাকে কালিমালিপ্ত করছে ‘ধরো আর ছাড়ো’ নামক পশ্চিমা বস্তুবাদী দর্শনে। বিবাহের পূর্বে তরুণ-তরুণীর প্রেম-প্রীতি ও মেলামেশা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। ইসলাম বিয়েশাদীর পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার অকৃত্রিম ও বৈধ ভালোবাসাকে কেবল উৎসাহিতই করেনি, বরং এতে সওয়াব ও কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সুতরাং পশ্চিমা অপসংস্কৃতির এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেদের ঈমান ও আমল রক্ষা করতে হলে আমাদের ফিরে আসতে হবে ইসলামের শাশ্বত শিক্ষায়।
ভালোবাসা হোক প্রাত্যহিক, পবিত্র এবং কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে; কোনো বিজাতীয় দিবসের মোড়কে মোড়ানো অশ্লীলতার অংশ হিসেবে নয়।
টিএইচএ/
