৩৬ নিউজ ডেস্ক :: চোখের সামনেই ট্রেনের নিচে চলে গেল ছেলে। একমুহূর্তও বিলম্ব নয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেকে বুকে নিয়ে শুয়ে থাকলেন সাহসী বাবা জহিরুল ইসলাম। একটি শ্বাসরূদ্ধকর অবস্থার মধ্যে পড়লো ভৈরব স্টেশনের মানুষেরা। কারো নিঃশ্বাস যেনো আর চলছে না।
গত মঙ্গলবার দুপুরে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনে ঘটে যায় এমন বিস্ময়কর ঘটনা।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের চরকাউনিয়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম ও সুমাইয়া বেগম দম্পতি ট্রেন থেকে নামার সময় তাঁদের দেড় বছর বয়সী সন্তান ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে পড়ে যায়। সন্তানের বিপদ দেখে মুহূর্তের মধ্যেই প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচে নেমে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকেন বাবা। এই দৃশ্য দেখে দম বন্ধ করে তাকিয়ে থাকেন লোকজন। সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে থাকেন কেউ কেউ। ধীরে ধীরে ট্রেনটি চলে যায়। বাবা–ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় উঠে আসতে দেখে সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।
ট্রেন চলা অবস্থায় ছেলেকে বাঁচাতে এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হলে সাহসী বাবা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘দেখলাম ছেলে নিচে পড়ে গেছে, ছেলের বিপদ। দাঁড়াইয়া থাকি কেমন করে, তাকে বাঁচাইতে হইব। এই চিন্তা থেকেই লাফ দিলাম।’
ট্রেনে ওঠার সময় মনে হলো বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাড়িতে রেখে এসেছি। বললাম, এই ট্রেনে যাওয়া যাবে না। আমরা ট্রেন থেকে সরে আসতে চাচ্ছিলাম। অনেক মানুষ। ভিড় ঠেলে নেমে আসার সময় ইয়ামিন হাত ফসকে নিচে পড়ে যায়। ট্রেন চলতে শুরু করে। নিচে নেমেই ইয়ামিনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ি।
জহিরুল ইসলামের ভাষ্য, সন্তানকে নিয়ে বিপদমুক্ত হওয়ার পর তাঁর নিজের কাছেই সবকিছু অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। তখন কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, জহিরুল ইসলাম ওমানপ্রবাসী। ১০ বছর ধরে ওই দেশেই আছেন। এই সময়ে তিনি কেবল দুইবার দেশে এসেছেন। দুই বছর আগে একই গ্রামের মেয়ে সুমাইয়াকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র সন্তানের নাম ইয়ামিন।
কিছুদিন আগেই দেশে আসা জহিরুল ইসলামের বৃহস্পতিবার ভোরে ওমানে তাঁর কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। বিমানের ফ্লাইট ধরতেই স্ত্রী–সন্তানকে নিয়ে ট্রেনে করে ঢাকায় যেতে মঙ্গলবার দুপুরে গ্রামের বাড়ি থেকে ভৈরব স্টেশনে আসেন।
জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রেনে ওঠার সময় মনে হলো বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাড়িতে রেখে এসেছি। বললাম, এই ট্রেনে যাওয়া যাবে না। আমরা ট্রেন থেকে সরে আসতে চাচ্ছিলাম। অনেক মানুষ। ভিড় ঠেলে নেমে আসার সময় ইয়ামিন হাত ফসকে নিচে পড়ে যায়। ট্রেন চলতে শুরু করে। নিচে নেমেই ইয়ামিনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ি।’
জহিরুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর তাঁরা সড়কপথে ঢাকায় যান।
এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে স্তব্ধ জহিরুল ইসলামের বাবা দুলাল মিয়া। বারবার তিনি কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করছেন। দুলাল মিয়া বলেন, ‘বাসে চলাচলে ছেলের অসুবিধা হয়। এ কারণে ট্রেনে যেতে ভৈরব গিয়েছিল। একটু এদিক–ওদিক হইলে ছেলে ও নাতি দুজনই শেষ হয়ে যাইত। তখন আমি কী করতাম।’
স্টেশন মাস্টার ইউসুফ বলেন, রেললাইন থেকে প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা প্রায় তিন ফুট। আবার লাইন থেকে প্ল্যাটফর্মের দূরত্ব প্রায় তিন ফুট। শিশুটি লাইন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে পড়েছিল। ট্রেনটিতে ১৪টি বগি ছিল। ইঞ্জিনের পরের তৃতীয় বগির কাছে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ওপর দিয়ে ট্রেন গেলেও চাকা থেকে বাবা–ছেলের অবস্থান দূরে থাকায় তাঁরা বেঁচে যান।
ভৈরব রেলওয়ে পুলিশের কয়েকজন সদস্য দুর্ঘটনার সময় কাছেই ছিলেন। ট্রেন চলে যাওয়ার পর বাবা–ছেলে রেলওয়ে পুলিশের হেফাজতে ছিলেন।
ভৈরব রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক আফজাল হোসেন বলেন, ‘একটি বগির দুই পাশে চার দরজা। একটি ট্রেনে ১৪ থেকে ১৫টি বগি থাকে। ৬০টি দরজা পাহারা দেওয়ার মতো লোকবল আমাদের নেই। ফলে ওঠানামার সময় যাত্রীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হয় না।’
