সম্পাদকীয় >>
রাজনীতিতে বিরোধিতা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সহমতের জায়গা যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্র হয়ে পড়ে শুধু কাগুজে বাস্তবতা। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এই শঙ্কাই ঘনীভূত হচ্ছে। সেই বাস্তবতা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গি।
বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্র গত কয়েক দশকে অনেকবার বদলেছে, কিন্তু যেটা বদলায়নি, তা হলো আস্থা সংকট। নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ—এসব মিলিয়ে জনগণের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনেও এই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
বিরোধী দলগুলোর একপক্ষ বলছে নির্বাচন ছিল একতরফা, অন্যদিকে সরকার পক্ষ বলছে নির্বাচন নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে। এই টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে জনগণের আস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। আর এই আস্থাহীনতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে গণতন্ত্র তার কার্যকর রূপ হারায়।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেটি যদি সহিংসতা, হুমকি ও অচলাবস্থার দিকে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের বিকাশ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এখনকার পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী মতকে সহ্য করার মানসিকতা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নেই। বিরোধী দল মানেই যেন শত্রু—এই মনোভাব থেকে বের হতে না পারলে রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব নয়।
এছাড়া, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। কমিশন যদি সব পক্ষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার কার্যকারিতাও সীমিত হয়ে পড়ে। এই জায়গায় সংস্কার ছাড়া আস্থা ফিরবে না।
গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। অনেক সময়ই সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ বা গবেষকরা প্রকাশ্যে কথা বললে সেটি ভিন্নভাবে নেওয়া হয়। অথচ গণতন্ত্রে মতের ভিন্নতা থাকা জরুরি এবং তা প্রকাশের স্বাধীনতা থাকাও সমান জরুরি।
তবে সবকিছুর মধ্যেও আশার জায়গা রয়ে গেছে। দেশের তরুণ সমাজ, সুশীল নাগরিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখনও গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী। তারা রাজনীতিতে গঠনমূলক পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তন আনতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকেই প্রথমে দায়িত্ব নিতে হবে।
সমাধানের পথে কিছু প্রস্তাব:
১. জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
২. নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কার করতে হবে।
৩. দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্বে স্বচ্ছতা ও তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
৪. গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ জরুরি।
একটি রাষ্ট্র তখনই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোয়, যখন তার রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত থাকে। শুধুমাত্র উন্নয়ন সূচকের আলোকে নয়, বরং গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে এগিয়ে যেতে হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহমতের চর্চা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এই মুহূর্তে সংকীর্ণ দলীয় লাভ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে সমঝোতা ও আলোচনার রাজনীতি ফেরানোর সময় এসেছে। গণতন্ত্রের ভিত্তি রক্ষায় এর বিকল্প নেই।
এই সম্পাদকীয়টি ৩৬ নিউজ-এর নিজস্ব বিশ্লেষণভিত্তিক অবস্থান থেকে রচিত। এখানে উত্থাপিত মতামত নিরপেক্ষ এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে উপস্থাপিত। ভিন্নমত, প্রতিক্রিয়া , মতামত ও পরামর্শ পাঠাতে পারেন: editor@36news.com
এআইএল/
